Month: জুন 2015

অসমাপ্ত মৃত্যু

১)এটা তোর তটভূমি,
এখানেই নোঙর ফেলেছি আমি,
কাছে আমার তোর জলরাশি,
পেছনে আমার বিপুল জনস্রোত,
দূরে এক বৃক্ষহীন মরুভূমি,
তার শুষ্ক, তৃষ্ণার্ত বালি,
তোর বুকের রক্ত শোষে,
তুই নিষ্পাপ, নিশ্চুপ, নিরুত্তর,
আমি তবু পাষাণ তো নয়,
তুই আমার প্রাণ,
তোর শিরার রক্তধারা
আমার বেঁচে থাকার সাক্ষী,
ঐ বিশাল মরুর সাথে
ক্ষমতা নেই লড়ার,
তার প্রতিটি বালুকণা
আমার অক্ষমতা দেখে হাসে।

২)হাঁটলাম দীর্ঘ পথ,
এলাম মরুর কাছে,
বুক জুড়ে তার সে
এক অন্তহীন তৃষ্ণা,
মনজুড়ে শুধু মিথ্যে অভিনয়,
পদ্য সেখানে অর্থহীন,
আর গদ্য আত্মঘাতী,
সে এক অপূর্ব ভয়ঙ্কর দৃশ্যপট,
হলুদ বালি যেন,
সূর্যের প্রাণশোষী তাপে উদ্দীপ্ত,

৩)হে শিল্পী, এ কেমন সৃষ্টি?
সুন্দর তবু ভয়ঙ্কর,
কণ্টকবৃক্ষ এখানে জীবিত,
তবু মানুষ কেন জর্জরিত?
সময়ের চাপে ওরা প্রতিবন্ধী,
তবু শিকড় ওদের শক্ত,
ধরিত্রীর বুকের প্রতিটি জলবিন্দু,
ওদের কাছে অমূল্য রত্ন,
হয়তো ওরা কাঁদে,
কেউ শুনতে পায়না ওদের আর্তনাদ,
ওরা একাকী নয় তো বটেই,
মৃত্যু ওদের খেলার সাথী।

৪)সহসা, এ কি আঁধি?
নাকি তৃষ্ণার্ত খুনি?
দাপিয়ে উড়িয়ে ছড়িয়ে
দিয়ে যাবে বুকের রক্ত!
সে কি নীলকন্ঠ?
তবে তার জটায় কেন নেই চন্দ্র?
আছে কেবল ঘৃণ্য মৃত্যুজাল,
কোটি কোটি বালি উড়িয়ে,
ছুটে আসে দানবের মতো,
পরোয়া করে না কোন বাধার,
পারে সে গিলতে এই বিশ্ব,
তবে এই কি যবনিকা?

গ্রীষ্মকাল

DSCN1486

রৌদ্র প্রতাপ গ্রীষ্মকাল

দিকে দিকে শূণ্যতা,

শূণ্য মাঠ ফুটিফাটা

কালবোশেখির ব্যস্ততা।

স্তব্ধ দুপুরে চাতকের ডাক

মনে আনে ব্যাকুলতা,

পুষ্করিণীর শুষ্কতা

তরুলতার মলিনতা।

বয়ে যায় শীর্ণ স্রোতস্বিনী

ধীর-মন্দ গতি,

ধীরে চলে ক্লান্ত পথিক

তৃষ্ণা নিবারনে মতি।

মধু পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র

গোধূলির শেষে,

দগ্ধ দিনের অবসানে

জ্যোৎস্না ছড়ায় হেসে।

দখিনা বায়ু বয়ে চলে

মৃদুমন্দ গতি,

মেতে ওঠে অলিকুল

ব্যস্ততা অতি॥

(আমার মা- ‘শ্রীমতি লতা পাহাড়ী’-এর কলমে)

ওদের কথা

child
বড়ো রাস্তাটা পেরোলেই ওপাশে বাঁদিকে ঘুরলে রেলস্টেশনটা পড়ে। স্টেশনটার গঠন এখনও অসম্পূর্ণ। সেই কাজ সম্পূর্ণ করার জন্যই জন পঞ্চাশেক আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন স্টেশনের পেছনদিকের মাঠে তাঁবু খাঁটিয়ে বসবাস করছিলো। রোজ বিকেলবেলা স্টেশনে হাওয়া খেতে গিয়ে সেই সময় ওদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনেককিছু জেনেছিলাম।

আমাদের, অর্থাৎ তথাকথিত শিক্ষিত বঙ্গসন্তানদের থেকে ওরা আরও অনেকগুণ বেশী বুদ্ধি ধরে। এই ব্যাপারটা ওদের তাঁবু লাগানোর উপকরণ ও গঠনশৈলী থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। একদিন সন্ধেবেলা এমন ঝড় হয়েছিলো যে, পাশের বাড়ীর একটি অ্যাজবাসটেস এর ছাদ থেকে অ্যাজবাসটেস খুলে অনেক দূরে ছিটকে পড়েছিলো। পরের দিন সকালে স্টেশনে গিয়ে দেখেছিলাম ওদের প্রত্যেকটি তাঁবু সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় ছিলো। প্রথমবার দেখে যৎপরনাস্তি চমকিত হলেও ক্রমে ওদের অপার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেতে থাকি। আমাদের এই শিক্ষিত সমাজে সন্ধে নামলেই অফিসফেরত কর্তা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন, গিন্নি একচোখে টিভি সিরিয়াল দেখতে দেখতে অন্য চোখটি ও হাতগুলির সাহায্য নিয়ে রান্নার জোগাড়যন্ত্র করেন এবং তাদের ছোট্ট সন্তান গৃহশিক্ষকের ঠ্যলা খেতে খেতে জর্জরিত হয়ে গেলেও একরাশ কষ্ট বুকে চেপে ধরে চুপচাপ বসে থাকে। তাঁবুগুলোর কাছে পরিবেশটা সম্পূর্ণ আলাদা। ওদের বাচ্চা, বুড়ো, জোয়ান, স্ত্রী, পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সারাদিন গা ঝলসানো রোদের মধ্যে অনাবিল ঘাম ঝরিয়ে কাজ করে। সন্ধেবেলা সব্বাই একসাথে জড়ো হয়। এক জায়গায় জ্বলন্ত আগুনের চারপাশে গোলাকারে সবাই বসে ওদের ভাষায় গান ধরে। সেই সময় ওদের দেখলে কে বলবে যে, ওরা এতটাই হতদরিদ্র! মনে হয়, চার পাঁচতলা আকাশছোঁয়া ইমারতগুলোর মালিকদের থেকেও ওরা সহস্রগুণ ধনী। দুই ঘণ্টাখানেক একত্রে গানবাজনা করে রাত্তিরবেলা বনমোরগের মাংস খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
ওদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো স্টেশনের নলকূপ থেকে জল নিতে আসতো। দুই হাতে দুটো বড়ো বালতিতে জল ভর্তি করে কোমরে কাপড় দিয়ে জলের বোতল বেঁধে রোদের মধ্যে রওনা দিত তাঁবুগুলোর দিকে। একসাথে চার-পাঁচটি বাচ্চা আসতো জল নিতে এবং সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হল, ওরা যখন ফিরতো তখন এতো ভার বহন করা সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টা করতে করতে ফিরতো। একদিন একটি বাচ্চাকে ডেকে জিগ্যেস করেছিলাম, ‘তুই পড়বি?’ উত্তরে সে বলেছিলো, ‘হাসাস কেনি, বাবু?!’ ব্যাপারটা তখন হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলাম। ওদের কাছে স্কুল, লেখাপড়া এগুলো স্বপ্নাতীত। ওরা ওদের জীবনের চরম সত্যিটাকে মেনে নিয়েছে।

কয়েকটি বাচ্চা আবার বড়ো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা চাইতো। দামী সানগ্লাস পরিহিত অফিসমুখো বঙ্গসন্তানরা তাদের দেখলেই দশহাত দূর দিয়ে দ্রুতবেগে চলে যেত। স্কুল, কলেজমুখো কিশোররা তাদের দেখে ঠাট্টা তামাশা করতো আর, ভিক্ষা চাইলেই হাজাররকমের গালিগালাজের বন্দুক বের করে অনবরত গুলি ছুঁড়তে থাকতো। কিছু দয়াবান পুরুষ ও নারীরা তাদের প্রায় রোজই কিছু না কিছু সাহায্য করতো। আর কিছু মানুষের সাহায্য করার ইচ্ছে থাকলেও রাস্তার মধ্যে মাথা নোয়ানোর ভয়ে তারা সর্বদা ওদের না দেখার ভান করে এড়িয়ে যেত।

ওদের দেখে সত্যিই অবাক হতাম। আমরা রোজকার
হাজারো ছোটখাটো ঝামেলা নিয়ে লক্ষাধিক নাটক, অভিনয় করে বেড়াই। সহস্র মেকি চাহিদার তাড়না প্রতিমুহূর্তে মনের মধ্যে ছোটাছুটি করে। কিন্তু, ওরা শৈশব থেকেই ওদের শিরা-উপশিরার রক্তে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করার অঙ্গীকারকে মিশিয়ে দিয়েছে। তবুও ওরা কখনও কাঁদে না। যান্ত্রিক শহুরে জীবনযাত্রার সমূহ মেকি শুণ্যতা থেকে অনেক কোটি আলোকবর্ষ দূরে ওদের এক মজার দুনিয়া। সেখানে হাড়ভাঙা পরিশ্রম থাকলেও দিনের শেষে স্বর্গীয় শান্তি, পরিবারের ছত্রছায়া, মায়ের স্নেহমাখা আঁচলের স্পর্শ রয়েছে। প্রকৃতি মায়ের স্নেহের দান দুহাত ভরে নিয়ে ওরা বড়ো হচ্ছে তিলে তিলে। আর, তথাকথিত অসভ্য জাতি ওরা, সভ্যজগতের জন্য গড়ে দিয়ে চলেছে সভ্যতা, সেই আদিমযুগ থেকে আদিঅনন্তকাল পর্যন্ত…..

(ছবি সৌজন্যে- নিজস্ব ক্যামেরা)

আমার শহর

ছুটির দিনগুলো জানালার বাইরে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকতাম। ট্রেনের কুঁ-ঝিক ঝিক শব্দ, পাখির ডাক, পাড়ার বাচ্চাদের হইহল্লা, রিক্সার শব্দ, সব মিলে এক জমজমাট পরিবেশ। দিনের আদ্যোপান্ত শুধু এক আনন্দ উৎসব চলত। সকালবেলা পাখির ডাকে ঘুম ভাঙতো। ব্যাল্কনির রেলিং এ শালিক, পায়রা, কাক তাদের ভোরের চিঠি নিয়ে আসতো। পাশের বাড়ির মিত্রবাবু বাজারব্যাগ হাতে নিয়ে তাঁর কলিগ বন্ধুর সাথে বাজারে যেতেন। একতারার সুরে রাঙিয়ে দিয়ে যেতেন হরি বাউল। ট্রেনে,বাসে করে বিভিন্ন জায়গার মানুষজন কর্মসূত্রে ছুটে চলেন। সে এক অদ্ভুত ব্যাস্ততা। দুপুরে পাড়াটা খানিক শান্ত থাকতো। দু-একটা এরোপ্লেন বাড়ির ওপর দিয়ে শোঁ করে উড়ে যেতো। বিকেলবেলা ছাদে উঠলেই ঘুড়ির লাটাই, মাঞ্জা দিয়ে শুরু হত ঘুড়ি ওড়ানো। একরাশ কাকের দল ঘুড়ির আশেপাশে বার পাঁচেক চক্কর কেটে শেষে ঘুড়িটা হস্তগত করতে পারবেনা বুঝতে পেরে ছুটে চলত অন্য কোথাও। সন্ধেবেলা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, ফুচকা খাওয়া, ঘুরতে বেরোনো সবই চলতো। অল্পস্বল্প খুনসুটি, ঝগড়া, মারামারি, সব মিলিয়ে যান্ত্রিক জীবনযাপন থেকে বেশ দুরেই থাকতাম। অবশেষে রাত্তিরবেলা দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেলে নামতো নিরবতা। অবশ্য, কয়েকটি কুকুর গভীর রাত অবধি অবিরাম ডেকে চলতো।

ক্রমে আধুনিকতা ও নগরায়ন শহরটাকে ঘিরে ধরলো। গাছপালা, মানুষজন সবই কেমন যান্ত্রিক হতে লাগলো। কারখানা, হাইরাইজ, শপিং মল, হাইওয়েতে ভরে যেতে লাগলো শহরটা। মানুষজন আরও ব্যাস্ত হতে লাগলো। নিঃশ্বাস ফেলারও সময় নেই। দিনটা যেন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। গাছপালাগুলো কোনমতে বেঁচে আছে। লেখাপড়া, আঁকা, আবৃত্তি, নাচ, গান একসাথে এত চাপে বাচ্চাদের সেই হইহল্লা আর আগের মত খুব একটা শোনা যায়না। আগের মত পুকুরের পাশে মাছরাঙাকেও আর খুব একটা দেখতে পাই না। গাড়িঘোড়ার শব্দে নিজের হৃদস্পন্দনও শোনা যায়না। বোকাবাক্স, ইন্টারনেট, ভিডিও গেমের চাপে সবাই যেন নির্বাক, স্বার্থপর, অলস। হরি বাউলের একতারার সুর এখন রক মিউজিক, র‍্যাপ এর শব্দে ম্লান। পড়াশোনা, কেরিয়ার এর চাপে এখন বন্ধুদের সাথে আড্ডাটাও উঠে গেছে। সময়ের বিবর্তনে আকাশপাতাল পরিবর্তন হয়েছে জীবনযাপনের।

শুধু একই থেকে গেছে আকাশটা। আজও সে চায় তার পায়ের তলাটাকে সবুজ দেখতে। মানুষকে আবার হাসিমুখে আনন্দ করতে দেখতে চায় সে। পাখিগুলোকে আবার হাসিমুখে সে তার বুকের মধ্যে দিয়ে উড়ে যেতে দেখতে চায়। সূর্যের স্নেহের আলো সে ছড়িয়ে দিতে চায় চারিদিকে। আমার শহরটাকে সে আবার আগের মত করে পেতে চায়।

নেপথ্যে

হলিউড ছবি তো, গ্রামে গঞ্জে খুব একটা চলে না। শুধু আমাদের মতো ডেঁপো ছোকরাদের কাছেই এগুলোর খবর পাওয়া যায়। তো, কোথাও একটা পড়েছিলাম যে, ‘টাইটানিক’ ছবিটা নাকি অস্কার পেয়েছে। তখন তো এটাও জানতাম না যে অস্কার জিনিসটা কি, খায় না মাখে!
পরে ক্লাস সেভেনে প্রথম একটা টিভি চ্যানেল থেকে বুঝতে পারলাম যে, অস্কার নাকি সিনেমায় বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার। সেদিন থেকেই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ছক কষে রেখেছিলাম, ‘টাইটানিক’ ছবিটা দেখতেই হবে। বাল্যবয়সে কমিকস্ বইতে টাইটানিকের জাঁদরেল ছবিগুলো দেখলে কেমন এক রোমাঞ্চ হত। চলচ্চিত্র হিসেবে পেলে কেমন লাগবে তাই ভেবে ভেবে এক অদ্ভুত শিহরণ হত।
অবশেষে বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হলে আমার এক বন্ধু তার কোন এক পরিচিতের কাছ থেকে বহু কষ্টে ‘টাইটানিক’ এর CD টা আনে। ক্লাবঘরে বসে যাই দল বেঁধে একদৃষ্টে টিভির দিকে তাকিয়ে উদগ্রীব হয়ে।
সুন্দরী নায়িকাকে দেখে তো অনেকেই বিভোর। কি অভিনয়! কি ডেডিকেশন! বন্ধুরা অনেকেই প্রশংসা করল। হতচ্ছাড়া সাদা কালো টিভিটা মাঝে মধ্যে মূর্ছা যাচ্ছে। এক আছাড়ে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করলেও ঐ ‘শুধু বিঘে দুই আছে মোদের ভুঁই। ওদিকে আবার ক্লাসিক্যাল মিউজিকের সরগম নিয়ে হাজির একরাশ মশার দল। এক হাত দিয়ে মশা মেরে, আর এক হাত দিয়ে কোল্ড ড্রিংক্স গলাঃধকরণ করতে করতে সে এক বিচিত্র মনোরম বিরক্তিকর অনুভূতি।
ধীরে ধীরে প্রেমকাহিনী জাহাজের ধ্বংসকাহিনীতে রূপান্তরিত হল। একরাশ উত্তেজনা বুকে চেপে প্রতি সেকেন্ড কাটতে থাকে। নিমেষের মধ্যেই জাহাজের নীচের ডেক থেকে মৃত্যুর কান্ড ক্রমে ওপরের দিকে শাখাবিস্তার করতে থাকে। প্রত্যেকটি যাত্রীর জীবন বাঁচানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টাকে যেন মৃত্যু তার দৈত্যাকার বিষাক্ত ফণা দিয়ে নিজের শরীরে গ্রাস করে নেয়।
ইতিমধ্যেই জাহাজের বিভিন্ন দিকে কয়েকদল পাগল ভায়োলিন নিয়ে আকাশপাতাল সুর তুলতে থাকে। দর্শকরা তো তাদেরকে একরাশ গালিগালাজ করতে শুরু করে। এছাড়াও শেষে এক মদ্যপ্রিয় যাত্রী তার মৃত্যুর আগে জীবনের শেষ মদ্যপান করেন। আর, অবশ্যই সবার শেষে জ্যাক এর সেই অমর মৃত্যু……
সব মিলিয়ে পরীক্ষার পর এক দুর্দান্ত বিনোদন। পরে একদিন মূল্যায়ণ করতে বসলে আমার বন্ধুরা তো সবাই তাদের পছন্দের দৃশ্যগুলো বলতে শুরু করে। কারও মন ছুঁয়েছে রোজ ও জ্যাক এর সেই ফ্লোর কাঁপানো নাচ, কারও মন ছুঁয়েছে সেই গা গরম করা চিত্রায়ন এর দৃশ্য, কারও মন ছুঁয়েছে ক্যাপ্টেন এর মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ, কারও মন ছুঁয়েছে জ্যাক এর মৃত্যুবরণ। ঐ আলোচনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাগ্বিতণ্ডা চলতেই থাকে। বহু কষ্টে ঝগড়া থামানো হয়।
বাড়ী ফিরে আকাশ পাতাল চিন্তা মাথায় আসে। বুকভরা তিক্ততায় মনটা ভারী হয়ে আসে। জ্যাক ও রোজ এর অমর প্রেমকাহিনী, এত্তোগুলো যাত্রীর মৃত্যু, হাড়কাঁপানো শীতের রাত্রে অতল আটলাণ্টিক এর গর্ভে তলিয়ে যাওয়া অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন দৈত্যাকার জাহাজ, একরাশ চিৎকার, একলক্ষ কান্না, এককোটি নিরবতা….

কোথাও যেন মনে পড়ছিল সেই আইসবার্গটাকে যেটায় টাইটানিক ধাক্কা দিয়েছিলো। কয়েকখন্ড বরফের টুকরো ছিটকেও পড়েছিলো জাহাজের ডেকের ওপর। নেপথ্যে থেকে মৃত্যুর আস্বাদ দেওয়া সেই খুনির জন্যই সেই দুই কাল্পনিক চরিত্রগুলো বুকে গঁথে গিয়েছিলো, আসল ঘটনাটার ভয়াবহতা অনেকটাই আন্দাজ করেছিলাম, জীবনটাকে নতুন করে চিনলাম, বুকফাটা কান্নাগুলো কানে বাজলো…

সূয্যিমামা

sunrise

ভোরবেলার সূর্যকে নিয়ে অনেক রকমের প্রবাদ আছে। আগেকার দিনের দাদু, দিদিমাদের বলতে শুনেছি, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সবার আগে সূর্যকে পেন্নাম করতে হয়।
তো যখন ছোট ছিলাম, ঘুম-টুম খুব একটা হতোনা রাত্রিবেলা। চারিদিকে শুধু লাফালাফি করতাম, খাতায় পেন্সিল দিয়ে হাবিজাবি অ্যাবস্ট্রাক্ট পেন্টিং করতাম আর, ঘুমোনোর নাম করে বিছনায় শুধু শুধু পড়ে থাকতাম এবং বাবা ঘুমোতে এলে কিছুতেই ঘুমোতে দিতাম না। সে যাই হোক, ঠাকুমার কথা শুনে রোজ কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে সূয্যিমামার দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে কিছু যেন বিড়বিড় করতাম। কি বিড়বিড় করতাম সেটা মনে নেই। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেছি শুনে মা প্রথমে খুব আনন্দিত হলেও পরক্ষণে টের পান যে, ভোরবেলা মোটেও পড়াশোনা করার জন্য বিছানা ছাড়িনি।
শুনেছি পুরাণে ও গীতাতেও নাকি সূর্যদেবতার অপার মহিমার কথা যথাযথভাবে উল্লিখিত আছে। ভোরে অবশ্য তাঁর দাপট খানিকটা কম হয়। আর গ্রীষ্মকাল হলে তো কোন কথাই নেই, তার চাপে সবাই অতিষ্ঠ। একটি বাচ্চা ছেলে আমায় একবার প্রশ্ণগুলো করেছিলো, আমরা তো সূর্য ও চাঁদকে একই রকম দেখি, তো, নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে পৌঁছে ওখান থেকে লাফিয়ে সূর্যে যেতে পারলেন না কেন? সূর্যে কি এলিয়েন থাকে? সূর্যের এলিয়েনগুলোর শরীর কি আগুন দিয়ে তৈরী? ইত্যাদি….ইত্যাদি…..
প্রশ্ণগুলো নেহাত ভাট বকার মতো শোনালেও মস্তিষ্কে মুষ্টাঘাত প্রয়োগ করেছিল। সত্যিই তো, একটা একরত্তি বাচ্চার চিন্তাশক্তি কদ্দূর চলে গেছে!
সকলেই তো রোজ সূর্যকে দেখি। গ্রীষ্মকালে প্রাণভরে গালাগাল দেই, অথচ কখনো এতো তলিয়ে ভাবাই হয়নি। হয়তো ওখানে মানুষ, জীবজন্তু, পোকামাকড়, গাছগাছালি ছিল, আকস্মিক প্রকান্ড দাবানলে সব জ্বলে গেছে, দীপ্ত লেলিহান শিখা এখনও থেকে গেছে। তিলে তিলে প্রতিমুহূর্তে জ্বলছে সে….অনন্তকাল….

ছবি সৌজন্যে- নিজস্ব ক্যামেরা

নিদ্রামগ্ন

হাওয়া লাগে গাছের পাতায়,
ডাক তুই ভোরের পাখি,
সূর্য মেশে দীঘির জলে
ঘুম শুধু তোর ভাঙতে বাকি।
চায়ের দোকানে উনুন ধরে
ধোঁয়া মেশে চারিদিকে,
খুদেরা স্কুলের পথ ধরে
দোকান খোলে একে একে।
দৈনিক তোর দরজার ওপারে
গোয়ালা দুধ দিয়েছে কখন,
মিত্রবাবু চলেন ব্যাগ হাতে
বাজার করতে সঙ্গে কয়েকজন।
তোর তবু চোখ খুলতে মানা
কাজের চাপে তুই পরিশ্রান্ত,
জানিস না তুই সূর্যোদয় দেখতে
ঘুম চোখে তুই খুব ক্লান্ত।
অফ্ ডে তো আছে একটাই
ঘুমিয়ে নে তুই প্রাণভরে,
পাশের ঘরে শাঁখ বাজলে পরে,
চাদরটা রাখ কানের ওপরে।
মায়ের ফোন আসছে কখন থেকে
মোবাইলটাতো সাইলেণ্ট করে রাখা,
পাছে যদি ঘুমটা যায় ভেঙে
চোখদুটো ক্লান্তিতে তোর মাখা।
ইচ্ছে করে দিতে চুমুক চায়ে?
তার জন্যে ছাড়তে হবে চাদর,
দেখবি তখন সূর্য কেমন খেলে
কেমনে বাতাস পাতাকে করে আদর॥