Month: এপ্রিল 2016

ইচ্ছেপূরণ

Dead body in a mortuary

 

 

একুশ বছর স্ত্রী,পুত্র,বন্ধুবান্ধব,আত্মীয় পরিজনদের গুরুভার বয়ে বেড়ানোর পর হঠাৎই একদিন ব্যালেন্স হারিয়ে হার্ট অ্যাটাকে গত হলেন মলয়বাবু। একরকম মরেই বাঁচলেন বলা যেতে পারে। রোজকার অফিসে বকুনি, স্ত্রী-র বকুনি, বাচ্চার আবদার ইত্যাদি ইত্যাদি হজম করতে গিয়ে, ‘অর্থ’ নামক উৎসেচকের অভাবে পকেট এবং অন্তরাত্মা উভয়ই গড়ের মাঠ। চড়ুইপাখি সাইজের স্যালারির ওপর নির্ভর করে বাড়তি আভিজাত্য দেখানো সম্ভবপর নয়, তা তিনি বহুপূর্বেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তথাপি অর্ধাঙ্গিনীর রক্তচক্ষুর ভয়াবহতা আন্দাজ করে শ্বশুরবাড়ীর রাজকীয় লাইফস্টাইল কপি করতে করতে আপাদমস্তক দেনায় ডুবে তাঁর পরিস্থিতি বড়োই সঙ্গীন ছিলো।

আগেও তিনবার হার্ট অ্যাটাক তাঁর দরজার কড়া নেড়ে গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই আক্রমনগুলিতে স্বর্গদর্শনের সৌভাগ্য হয়নি মলয়বাবুর। এবার হয়তো পরমাত্মা তাঁর কাকুতি-মিনতি শুনতে শুনতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই স্ট্রেট ড্রাইভে উতরে গেলেন।

মৃত্যুর পর অবশ্য তাঁর স্ত্রী গলা ফাটিয়ে কান্না জুড়েছিলেন। দেখে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। উপরন্তু, সোনাই ফ্যালফ্যাল করে একবার তার মায়ের দিকে, একবার মলয়বাবুর মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে কিছুই ঠাওর করতে না পেরে আকাশপাতাল ভাবছিলো। সোনাইয়ের চোখের কোণায় একটু জলের চিহ্ন দেখে খানিক কষ্ট হচ্ছিলো মলয়বাবুর। শেষবারের মতো ক্ষমাও চাইতে পারলেন না। আর বেশীক্ষন তিনি এসব দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে স্বর্গলোকে আসন্ন অ্যাডভেঞ্চারের কথা ভাবতে ভাবতে সময় কাটিয়ে দিলেন।

 

he ma matajiiiiiiiiii   !!!!!!!!!!_Fotor

 

 

প্রায় ঘন্টাদুয়েক পর কান্নার শব্দগুলো বন্ধ হলো। চোখের সামনে এক কিম্ভুতকিমাকার প্রাণী এসে কিছুটা কিডন্যাপ করার স্টাইলে তাঁকে তুলে নিয়ে গেলো।

 

খানিক নীরবতা।

 

চোখ খুলে দেখলেন, সাক্ষাৎ ‘স্বর্গউড’-এর গব্বর সিং! যমরাজ! চিনতে ভুল হলো না। ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ তাঁর ঠোটস্থ! করজোড়ে নমস্কার জানালেন মলয়বাবু।

 

jomraj_Fotor

 
– মলয়বাবু, আফটারলাইফে স্বাগতম। মর্ত্য ছেড়ে কেমন লাগছে।
– দারুন! মাচ্ সিকিওর্ড!
– স্ট্রেঞ্জ! আপনি খুশি হচ্ছেন?
– সে আর বলতে! কয়েকহাজার প্রেশর থেকে রিলিফ। আর তাছাড়া, যার ধর্মতলা অবধি যাওয়ার বাজেট নেই, নিখরচায় একেবারে পৃথিবীর বাইরে ট্যুরে এলে খুশি তো হবেই।
– তা ঠিক, তা ঠিক! যাক গে, এখন বলুন এখানে আপনার সেবায় আমি কি করতে পারি?
– মানে? ঠিক বুঝলাম না। আপনি আমার চাহিদা পূরণ করবেন?
– নিশ্চয়ই! গেস্ট বলে কথা! তা ও আবার টেম্পোরারি।
– ইয়ে, এরপর কোথায় পাঠাবেন, জানতে পারি?
– ডিসকাশন্ চলছে। তবে আর মিডল ক্লাস ফ্যামিলিতে যাচ্ছেন না।
– হোয়াট? মানে, আমাকে আবার মানুষ হয়ে জন্ম নিতে হবে? প্লিজ, নট্ এগ্যেইন!
– দেখুন, এ জন্মে আপনার পাপের বোঝা নগণ্য। তাই ওপরমহল থেকে এই ডিসিশন নেওয়া হয়েছে।
ওসব ছাড়ুন, বলুন আপনার এখানে রিকোয়ারমেন্ট কি কি?
– বলছি, তার আগে আপনি বলুন তো, আগের তিনবার হার্ট অ্যাটাকের বেলা আপনি আমায় নিতে আসেননি কেন?
– শুনুন মলয়বাবু, আপনার জীবনের টানাপোড়েন, দুঃখ, একাকীত্ব কোনোটাই আমার অজানা নয়। কিন্তু আমাকেও আইনের সীমারেখার মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। ওপরমহল থেকে আমায় তখন কোনও অর্ডার দেওয়া হয়নি। কিন্তু এবার আর ওঁরা সহ্য করতে পারেননি। তাই ওঁদের কথায় আমি আপনাকে এখানে নিয়ে আসি। এখানে আপনি খুশিতে থাকতে পারেন। কারণ, মর্ত্যের মতো নাটুকে সমাজ আপনি এখানে পাবেন না।
– একটা রিকোয়েস্ট করতে পারি?
– বলুন।
– আপনি বলেছিলেন, আমার চাহিদা পূরণ করবেন। প্লিজ, পরের বার আমায় পৃথিবীতে মানুষরূপে জন্ম দেবেন না।
– কি বলছেন, মলয়বাবু?
– ঠিকই বলছি। আমার এই ইচ্ছেটি পূরণ করে দিন, যমরাজ। এখানে আমার কিছুই চাই না। পরের বার পৃথিবীতে আমি সারাদিন রোদের পাতায়, কিম্বা মাঠের আলে, বাতাসে, জলে, মাটিতে মিশে থাকতে চাই। অর্থ, অনর্থ, সম্পর্ক, আভিজাত্য, ছদ্মবেশ, সবকিছুর আড়ালে প্রকৃতির কোলের আদর গায়ে মেখে বাঁচতে চাই। আপনি আমায় সাহায্য করবেন তো?
– মলয়বাবু, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করবো ওঁদের রাজি করানোর। বাকিটা ওনাদের ইচ্ছে। তবে, ওনারা রাজি না হলে, প্লিজ, আপনি ভেঙে পড়বেন না। এই যাত্রা খুব কঠিন।
– আপনি চেষ্টা করবেন তো?
– কথা দিলাম!

 

 

 

 

শুনেছি, মলয়বাবু পরের বার একটি গাছের ডালে জন্ম নিয়েছেন। তবে, শেষরক্ষা হলো না। তিনমাস পর এক জহ্লাদ এসে তাঁকে খাঁচায় বন্দী করলো। তারপর, এ খাঁচা থেকে ও খাঁচা….যাত্রাটি সত্যিই খুব কঠিন॥