Month: মে 2017

পুনর্মিলন

বাইরে আইসক্রিমওয়ালার ‘টিং-টিং’ শব্দে এক লহমায় ঘোর কাটলো ভুজঙ্গবাবুর। বেশ আয়েস করে ইজিচেয়ারে নিজেকে বিস্তৃত করে নিজের পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির কথা ভাবছিলেন, হতচ্ছাড়াটা সব মাটি করে দিলো। ভুজঙ্গবাবুর পরিবার বলতে তিনি এবং তিনি নিজেই। এই একান্ন বছর বয়সেও তিনি গর্বিত ব্যাচেলার। তিনকুলে তাঁর কেউ নেই, যাঁরা আত্মীয় পরিজন রয়েছেন, কেউ তাঁর ধারেকাছে ঘেঁষেন না। লোকটি মারাত্মক বদরাগী এবং ততোধিক কৃপণ। এক্সট্রা খরচার ভয়ে তিনি বিয়েই করেননি। এমনকি প্র্যাক্টিক্যালের খরচা আলাদা দিতে হবে শুনে কলেজে ভর্তির সময়ে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ছেড়ে অঙ্কেই নিজেকে টেনে ঢুকিয়েছিলেন। তাঁর বাড়ীতে কোনও কাকপক্ষীও আসে না। মোদ্দা কথা হলো, তিনি নিজে ব্যতিত জগৎসংসারের আপামর প্রানীকুল তাঁর উদার মনোভাবের বিষয়ে অবগত ছিলো। পাড়ায় পুজো-টুজো হলে তাঁর কাছে কস্মিনকালে চাঁদা চাইতে কেউ আসতো না। তাতে অবশ্যি তাঁর কোনওরকমের অভিযোগ ছিলো না, উপরন্তু খুশি হতেন। সাতে-পাঁচে নিজেকে না জড়িয়ে কুপমন্ডুক ধনী হওয়ায় অনেক বেশী সুখ। 

এহেন ভুজঙ্গবাবু আইসক্রিমওয়ালার ঘন্টার শব্দে তেড়েফুঁড়ে উঠে বসে অপার খিস্তাচ্ছেন, এমন সময়ে দরজায় ‘খট্-খট্’ আওয়াজ। এক নিঃশ্বাসে একগেলাস জল খেয়ে মেজাজ খিঁচড়ে দরজা খুলতেই এক প্রাপ্তবয়স্ক লোক সামনে দাঁড়িয়ে।
– নমস্কার, আপনিই ভুজঙ্গবাবু?
– হ্যাঁ। কি চাই?
– আজ্ঞে, একটু কথা ছিলো। ভেতরে আসতে পারি?
নিমেষে কুন্চিত ভ্রু নিয়ে ভুজঙ্গবাবু ভাবলেন, কাউকে বিশ্বাস করা যায় না আজকাল। তাঁর এই এত্তো বছরের জমানো ধনসম্পদ যদি ব্যাটা লুটে নিয়ে পালায়, তাহলে তাঁর রেপুটেশন যথার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
– না, যা বলার ওখান থেকেই বলুন। আর, কিছু বল‍ার না থাকলে ভাগুন।
– না, মানে, একটু পরামর্শের দরকার ছিলো। আর, ‍অাপন‍ার চেয়ে অভিজ্ঞ মানুষ এ পাড়ায় আর কে আছে বলুন?!
গোঁফটাকে সরলরেখা বানিয়ে মুচকি হেসে খানিক গর্ব বোধ করলেন ভুজঙ্গবাবু। এতোকাল নিজের সম্বন্ধে সবার মুখে গালিগালাজ ব্যতিত আর কিছুই শোনেননি। যদিও ধনাত্মক বিশেষণের অভাব তাঁর অন্তর্সত্ত্বার কিপ্টেমিকে তিলমাত্র ক্ষুণ্ন করতে পারেনি, তবুও, প্রথমবার নিজের সম্বন্ধে অন্যের মুখে ভালো কিছু শুনে বেশ লাগলো তাঁর।
– আসুন ভেতরে। তবে, জুতো খুলে। আমি মাসে একবারই এই ঘরের মেঝে পরিষ্কার করি। কালই করেছি।
– আপনি যা বলবেন।
মধ্যবয়স্ক লোকটি ভেতরে এসে সোফায় বসলো। কথা প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, ভুজঙ্গবাবুর সোফাটি তাঁর এক মাসি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন বছর কুড়ি আগে। তিনি খুব ক্ষিপ্ত হন্, তাঁর মতে একটি খাটিয়ার ওপর যখন বসা, শোয়া, পড়াশোনা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ সম্পাদিত হতে পারে, তখন সোফা কিনে ফালতু খরচার কোনও অর্থ নেই।


ভুজঙ্গবাবু বলে উঠলেন,
– হ্যাঁ। তা, মহাশয়ের কি কাজে আসা হয়েছে?
– বলছি। তার আগে অতিথি আপ্যায়ন করুন। প্রথমবার আপনার বাড়ীতে এলাম। চা-মিষ্টি কিছু দেবেন না?
– আপনি খুব হ্যাংলা, মশাই! এভাবে সামনে থেকে কেউ চায়?
– না। মানে, ভাবলাম, এতো বিশাল অর্থভান্ডারের দায়িত্ব আপনাকে দেবো, আর আপনি আমায় এককাপ চা খাওয়াতে পারবেন না?!
– কোন অর্থভান্ডার? একটু খোলসা করে বলবেন?
– বলছি। আগে চা টা পাই! এতোটা রাস্তা হেঁটে ঘেমে গিয়েছি। শরীরটা একটু জুড়োই। তারপর বলছি।
– চায়ে চিনির প্রয়োজন নেই তো?!
– বলেন কি?! চিনি ছাড়া চা ইজ লাইক ফুটো ছাড়া টাইটানিক।
– মানে, চিনিটাও জোগ‍ান দিতে হবে।
– আলবাৎ।
মিনিট তিনেকের মধ্যে গরম চা এনে হাজির করলেন ভুজঙ্গবাবু।
– আজ্ঞে, বিস্কুট?!
– তার কথা তো হয়নি।
– সব কি আপনাকে বলে দিতে হবে মশাই?! অতিথি সৎকার বোঝেন না? আপনি এত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি।
– আনছি। একটা?
– উঁহু! তিনটে।
কটমট করে খানিকক্ষন ত‍াকিয়ে বিস্কুট আনলেন ভুজঙ্গবাবু।
– ধন্যবাদ। সিগ্রেট পাওয়া যাবে?
– ধূমপান করি না। উপরি খরচা হয় তাতে।
– ও হ্যাঁ! আপনি তো আবার ব্রেকফাস্টও করেন না।
– আপনি জানলেন কিভাবে?
– জানি। জানি। পাড়ার লোকেদের মুখে শুনেছি। আপনার মতো হাড়কেপ্পন লোক পুরো ভারতবর্ষে দুটি মেলা ভার।
– হুম। সে যাই হোক। দু’বেলা পেট ঠুসে খাই। মাঝখানে আর খুচুর খুচুর চপ, কেক, মুড়ি ইত্যাদি খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। খরচা বাঁচে। কিন্তু আপনি কি জন্যে এসেছেন সেটা বলবেন? কোন বিপুল অর্থভান্ডারের জন্যে কি ব্যাপার বলুন।
– বলছি। উতলা হচ্ছেন কেন? ধৈর্য্য রাখুন। এতো বদরাগী মেজাজ ভালো নয়। নিউজ চ্যানেলে বলে, হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, কিংবা ধরুন নিউমোনিয়া।
– নিউমোনিয়া?! আপনি তো মশাই মূর্খও বটে।
– তা বলতে পারেন। এই অধমের জ্ঞানগম্যি যথাসম্ভব স্বল্প।
– চা তো শেষ হতে চললো। এবার তো বলুন।
– আপনি প্রতিদিন সকালে মর্নিং ওয়াকে যান। কিংবা ধরুন, মাঝে মধ্যে পার্কে, বাড়ীর ছাদও তো রয়েছে, সেখানে গিয়ে বসুন।
– তাতে কি উদ্ধার হবে?
– হৃদয় সতেজ হবে।
– আমার হৃদয় যথাসম্ভব সতেজ রয়েছে এবং থাকবে। হুলোমার্কা নজর দেবেন না।
– ছি..ছি..নজর দেবো কেন?! আপনার জন্যে খুব চিন্তা হয়।
– আপনি আবার কোন্ শুভাকাঙ্ক্ষী এলেন?
– জাভেদকে মনে আছে স্যর?
– নাইন্টি সেভেন?
– হ্যাঁ স্যর। আপনার তো মনে আছে দেখছি।- কিভাবে ভুলবো বল্?! তোদের কতো পিটিয়েছি। হতচ্ছাড়া সব। তা অ্যাদ্দিন পর কি মনে করে?!
– আমার মেয়েটাকে পড়াতে হবে স্যর। খুব বিচ্ছু। জানি, আপনি প্রাইভেট টিউশন দেন না। তাই রিকোয়েস্ট করছি স্যর। আপনি ছাড়া ওকে আর কেউ অঙ্ক বোঝাতে পারবে না।
– বটে?
– আসবেন তাহলে?
– যাবো যাবো।
– আজ তাহলে উঠি স্যর।
– আয়।
– সরি। আপনার চা-বিস্কুট মিলে অনেক খরচা করিয়ে দিলাম।
– বেতনে অ্যাডজাস্ট করে নেবো।
– (মুচকি হেসে) আসছি স্যর।

(ইলাস্ট্রেশন- http://www.clipartof.com)