Month: ডিসেম্বর 2017

চা’ওয়ালা

02

মৃদু-মৃদু হাওয়া দিচ্ছে, সদ্য সিঙাড়ার গন্ধ, চায়ের গ্লাসের টুংটাং। বাপিদা’র দোকানের এই এক যাকে বলে ‘খাস বাত’। কাস্টোমার কখনও বোর হবে না। সারাক্ষন বাপিদা জ্ঞান ঝেড়েই চলেছে। কখনও বৌকে খুশি রাখার পদ্ধতি, কখনও দীপিকার বেশভূষা, কখনও বিরাটের কভার ড্রাইভ, আবার কখনও দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে হাজারো টিপ্পনি, সব পাবেন বাপিদা’র থেকে। মানুষটি নিপাট ভদ্র। এত ভদ্র যে, এক লিটার দুধ দিয়ে একশোজন মানুষকে চা খাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু চা নিয়ে কেউ কখনও অভিযোগ জানায়নি, রেকর্ড আছে।
আমার তো বেশ লাগে জায়গাটা। কেমন একটা লোকসভা- লোকসভা গোছের। প্রসূনদা বৌদির রান্না নিয়ে আলোচনা করছে, রবিনকাকা কোরাপশান নিয়ে বিদ্রোহী বাতেলা দিচ্ছে, বাপিদা স্পিকারের মতো সবকিছু সামাল দিচ্ছে, আর আমি বেচারা মনমোহন সিংয়ের মতো একসাইডে চুপচাপ বসে আছি। চারিদিক থেকে জ্ঞানের তীর এসে বিঁধছে। এমন তীরে আহত হতে ক‍ার না ভালো লাগে বলুন!
শুধু সমস্যা হয় বিলু এলে। বিলু আমাদের পাড়ায় থাকে। ভালো নাম কি যেন একটা, ইয়ে, আমারও মনে থাকে না। বিলুর বাবা এই চত্বরের একমাত্র ডাক্তার। ব্লাডপ্রেশার চেক থেকে অস্ত্রোপচার সব একাই পারেন। খাঁটি ট্যালেন্টেড মানুষ। বিলু এখন ইউনিভার্সিটি পাস আউট। সারাদিন উড়ে উড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যেবেলা বাপিদা’র দোকানে আসে মাঝে সাঝে। এসেই দুম্ করে এমন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে বসবে, যার উত্তর দেওয়ার সাধ্যি বাপিদা’র চৌদ্দ্য পুরুষের নেই। আর, আমার তো নেই ই।

সেদিন পূর্ণিমার সন্ধ্যেবেলা বিলু লেবু চায়ে টান দিয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করলো,’আচ্ছা, এই যে তোরা চা খাস, ত‍াতে আবহাওয়া কতোটা ড্যামেজ হয় জানিস?’

আকস্মিক কসমিক সওয়াল! এর উত্তর জুত করে দিয়ে ফেলবো, নাহ্, এতোটা বুদ্ধিমান বা পাগল আমি নই।

প্রসূনদা একবার ড্যাব-ড্যাব করে বিলুর দিকে চেয়ে চশমাটা খুলে বললো,’চা, আর আবহাওয়া? মানে, পুরো চালতা আর সিমেন্টের মতো ব্যাপার। টকিং অ্যাবাউট চা, সে তো তুইও হুস-হুস শব্দ করে খাস, আর যদ্দূর আবহাওয়‍া সম্পর্কে জানি, তার পেছনে কাঠি করার জন্যে তো অন্য ঘটনা রয়েছে, ঐ যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং’।

05

-‘উঁ হুঁঃ, এখানেই তো হোঁচট খেলে তুমি। কসমোলজি বলছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্ষান্ত হয়েছে। কুমেরুর বরফ গলবে না, তুমি ভাসবে না।’

-‘ভাসবো না! ইয়ে, মানে, তবে যে খবরে, বইতে লেখা ছিলো!’

-‘স্রেফ ভাঁওতা। কখনও ভেবে দেখেছো, এই যে তুমি সারাদিনে তিরিশ খানা সিগারেট টেনে ধোঁয়া ওড়াও, সেটা কতো ক্ষতি করছে!’

-‘ঐ টুকুতে কিছু হয় নাকি?’

-‘এক্সাক্টলি। তেমনি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে পৃথিবী যে হারে গরম হচ্ছে, তাতে তুমি কেন, তোমার আগামী কুড়ি প্রজন্মও হেসে-খেলে টিকে যাবে।’

-‘তা হোক্। কিন্তু বললি না এখনও চ‍‍া কিভাবে দূষণ করছে?’

-‘ও তুমি বুঝবে না।’

-‘কি যে সব বলে!’

বাপিদা দোকানের ভেতর থেকে বলে উঠলো,’নাহ্! তোরা আর কেউ বড়ো হলি না। উল্টোপাল্টা কথাবার্তা সারাক্ষণ! ওদিকে দেখ্ আমার মতো চাওয়ালা প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলো! আমারও এবার একটা চেষ্টা করার দরকার অাছে। আর ভাল্লাগে না একদম এসব।’

বিলু ফিচ্ করে হেসে বললো,আগে লুঙ্গি সামলাতে শেখো, তারপর দেশ সামলাবে। কালই মিত্র বৌদির সামনে খুলে যাচ্ছিলো। অঘটন হতে বেশী সময় লাগে না। সাবধান হও।’

-‘পেছনে না লেগে এবার বিদেয় হ না বাপু। একটা সরকারি চাকরি জুটিয়ে বিয়ে-থা করে হিল্লে কর্। আর কদ্দিন শুধু আমাদের জ্ঞান দিবি?’

-‘সরকারি চাকরি? কে দেবে?’

04

-‘শুনলাম প্রাইমারির তো দশ লাখ রেট চলছে। কেন্দ্রের চাকরিও আছে। তোর কি টাকার অভাব? বাবাকে বল্ ডিসপেনসারিটা বেচে দিতে। পাক্কা একখানা চাকরি জুটে যাবে।’

-‘রক্ষে করো বাপিদা, ঐ যৌতুক আমার চাই না।’

-‘কেন? সমস্যা কী? আরে পুরো লাইফ সেট হয়ে যাবে। তারপর আনন্দ কর জীবনভর।’

-‘হ্যাঁ। এই আনন্দ লোকে নিতে যাচ্ছে বলেই তো চাকরির নিলাম হচ্ছে। সবাই দর লাগাচ্ছে। যার দর হাঁক বেশী, তার চাকরি।’

-মন্দ কী? এতো বছর তোকে খাওয়াবে, পরাবে, তোর ভরণপোষণ করবে, আর তুই তার আগে একটু খসাতে পারবি না!’

-‘না। পারবো না। এটাই তো সমস্যা। তুমি সুখ ভালোবাসো, নীতি নয়, স্রোত ভালোবাসো, সত্য নয়। তাই তুমি হাসিমুখে লাইনে দাঁড়িয়েছিলে ছ’মাস। বলতে পারো, তোমার টাকা তুমি নেবে তাতে চারঘন্টা লাইন কেন দিতে হবে তোমায়? চোর তো তুমি নও, আহম্মকও নও।’

-‘সে একটু মানিয়ে নিতে হয়, সবার ভালোর জন্যে।’

-‘তারপর? কি হলো? তোমার চারশো ঘন্টার ঘাম ঝরানো কালোটাকাওয়ালাদের চর্বি ঝরাতে পারলো কিনা জেনেছো?’

-‘নিশ্চয়ই হয়েছে। সবাই তো আর বোকা নয়!’

মুচকি হেসে বিলু বললো,’তোমারই বন্ধু তো ওমর। তাকে এপাড়ায় কেনো থাকতে দেওয়া হয়নি সেটা তুমি জানো না?
বাপিদা, উপেক্ষাটা কিন্তু সমাধান নয়। কিছুক্ষন আগেই বলছিল‍াম, চা দূষিত করছে আবহাওয়াকে, একটা চাওয়ালা করছে পুরো দেশটাকে।’

………..

বেশ অনেকদিন আর দেখা হয়নি বিলুর সাথে। শেষবার দেখা হয়েছিলো পুজোর পরে পরে। তখন জগতশুদ্ধু সামগ্রীর সাথে আধার লিঙ্ক করাচ্ছি। সেদিনও আমায় অনেক বাতেলা ঝেড়েছিলো। কিছু মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছিলো,তবু মনে আছে।
এখন আর বিলুকে দেখা যায় ন‍া এ পাড়‍ায়।
শুনেছি এখন নিজে ব্যবসা করে। শেষ অবধি হার মানলো না ছেলেটা।।

 

 

Photo Courtesy- raghukamath.com

ইন্টারভিউ (ভেতর দেখা)

এই ব্রম্ভান্ডের প্রতিটা প্রাণী কখনো না কখনো ইন্টারভিউ এর খপ্পরে পড়েছে। সংসারে আমাদের সবাইকেই হরবখত এই কাজটা করতে হয়। আমাদের ধারণা যিনি ইন্টারভিউ নেন তিনি সুপন্ডিত এবং অদৃশ্য এক হাঁড়ি প্রার্থীর মাথায় ভাঙার জন্য সদা প্রস্তুত। কুটিল কৌশলে তিনি বেমালুম,  প্রার্থীর কোষ্ঠী বিচার করেন।সুপ্রীম পাওয়ার থেকে জিরো আওয়ার সব তিনিই।
                    এ হেন কৌশলের মুখে ছাই দেওয়ার হরেক প্রচেষ্টা অনেকের সাথে আমিও করেছি। কিভাবে কর্তাদের পাল্টা চাপে ফেলে তার চক্রব্যুহ কেটে বেরিয়ে আসা যায় সেটা আয়ত্ত করাই মুখ্য। প্রথম ইন্টারভিউ তে গিয়েছিলাম একটা লিফট্ কোম্পানীতে, দলিল দস্তাবেজ নিয়ে প্রকান্ড হলঘরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ,বেরিয়ে আসা কয়েকজনের থেকে জানতে পারলাম গাড়ীর বৈদ্যুতিক নকশা নিয়েই বেশী প্রশ্ন হচ্ছে, এবং যে প্রার্থী যে গাড়ীতে চড়েছে তার প্রশ্ন সেই গাড়ী চেপেই আসছে। সুতরাং..
ঠিক করলাম আমাকে বাঁচাতে পারে একমাত্ৰ গরুর গাড়ী।

                      -আচ্ছা, অনিমেষ গুড মর্নিং। আপনি কোন কোন গাড়ী চড়েছেন?
সপ্রতিভ হয়ে বললাম , আমি গরুর গাড়ী ছাড়া কিছুতেই চাপিনি। 
খানিক টা আব গিলে তিনি বললেন, কলকাতায় এলেন কিভাবে? 
-কেনো হেঁটে হেঁটে ….
 এবার তিনি বললেন, আচ্ছা আপনি ট্রেন দেখেছেন?

 বললাম হু দেখেছি “পথের পাঁচালী” সিনেমাতে , কাশ বন দিয়ে দৌড়াচ্ছে ….
উনি বললেন , টিভিতে দেখেছেন?  
বললাম, না টিভিতে নয় খবরের কাগজের ছবিতে। 

(মনে মনে ভাবছি একে ইলেকট্রিক এর কিছু দেখেছি বললেই আমার সাড়ে সতেরো অবস্থা হবে)
 উনি এবার বললেন , আচ্ছা  এই টিউবলাইট টা সুইচ অন করলে কিভাবে কাজ করছে ?  
আমি বললাম , ইলেকট্রিক সার্কিট সম্পূৰ্ণ হয়েছে তাই।

এটা শুনে আমার মাথায় হাঁড়ি ভাঙ্গার উচ্ছাসে বলেই ফেললেন ….আচ্ছা ইলেকট্রিক কি ?

( ডুবে যাবার আগে ,বাঁচার অন্তিম চেষ্টা ….মনস্থির করলাম , এ চাকরী আমার জুটবেনা। সপ্তবর্ষব্যাপী চলা এই যুদ্ধের ইতি টানবো এবার )

আমি বলেছিলাম , পৃথিবীতে এখন সবকিছু নকল . তবুও খাঁটি জিনিষ পাওয়া যায় , সেই খাঁটি জিনিষটাই এই ইলেকট্রিক।
 মুচকি হেসে বলেছিলেন , খাঁটি যে কি করে বুঝবো ?
মুখের হাসি চওড়া করে বলেছিলাম , হাতে নিয়ে পরখ করে দেখুন। 

তবেই খাঁটি ইলেকট্রিক বুঝতে পারবেন।
শেষে এটাই বলেছিলেন , কোন কলেজ থেকে পাশ আউট ??