লিখেছেন: Abhinandan Pahari

চা’ওয়ালা

02

মৃদু-মৃদু হাওয়া দিচ্ছে, সদ্য সিঙাড়ার গন্ধ, চায়ের গ্লাসের টুংটাং। বাপিদা’র দোকানের এই এক যাকে বলে ‘খাস বাত’। কাস্টোমার কখনও বোর হবে না। সারাক্ষন বাপিদা জ্ঞান ঝেড়েই চলেছে। কখনও বৌকে খুশি রাখার পদ্ধতি, কখনও দীপিকার বেশভূষা, কখনও বিরাটের কভার ড্রাইভ, আবার কখনও দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে হাজারো টিপ্পনি, সব পাবেন বাপিদা’র থেকে। মানুষটি নিপাট ভদ্র। এত ভদ্র যে, এক লিটার দুধ দিয়ে একশোজন মানুষকে চা খাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু চা নিয়ে কেউ কখনও অভিযোগ জানায়নি, রেকর্ড আছে।
আমার তো বেশ লাগে জায়গাটা। কেমন একটা লোকসভা- লোকসভা গোছের। প্রসূনদা বৌদির রান্না নিয়ে আলোচনা করছে, রবিনকাকা কোরাপশান নিয়ে বিদ্রোহী বাতেলা দিচ্ছে, বাপিদা স্পিকারের মতো সবকিছু সামাল দিচ্ছে, আর আমি বেচারা মনমোহন সিংয়ের মতো একসাইডে চুপচাপ বসে আছি। চারিদিক থেকে জ্ঞানের তীর এসে বিঁধছে। এমন তীরে আহত হতে ক‍ার না ভালো লাগে বলুন!
শুধু সমস্যা হয় বিলু এলে। বিলু আমাদের পাড়ায় থাকে। ভালো নাম কি যেন একটা, ইয়ে, আমারও মনে থাকে না। বিলুর বাবা এই চত্বরের একমাত্র ডাক্তার। ব্লাডপ্রেশার চেক থেকে অস্ত্রোপচার সব একাই পারেন। খাঁটি ট্যালেন্টেড মানুষ। বিলু এখন ইউনিভার্সিটি পাস আউট। সারাদিন উড়ে উড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যেবেলা বাপিদা’র দোকানে আসে মাঝে সাঝে। এসেই দুম্ করে এমন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে বসবে, যার উত্তর দেওয়ার সাধ্যি বাপিদা’র চৌদ্দ্য পুরুষের নেই। আর, আমার তো নেই ই।

সেদিন পূর্ণিমার সন্ধ্যেবেলা বিলু লেবু চায়ে টান দিয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করলো,’আচ্ছা, এই যে তোরা চা খাস, ত‍াতে আবহাওয়া কতোটা ড্যামেজ হয় জানিস?’

আকস্মিক কসমিক সওয়াল! এর উত্তর জুত করে দিয়ে ফেলবো, নাহ্, এতোটা বুদ্ধিমান বা পাগল আমি নই।

প্রসূনদা একবার ড্যাব-ড্যাব করে বিলুর দিকে চেয়ে চশমাটা খুলে বললো,’চা, আর আবহাওয়া? মানে, পুরো চালতা আর সিমেন্টের মতো ব্যাপার। টকিং অ্যাবাউট চা, সে তো তুইও হুস-হুস শব্দ করে খাস, আর যদ্দূর আবহাওয়‍া সম্পর্কে জানি, তার পেছনে কাঠি করার জন্যে তো অন্য ঘটনা রয়েছে, ঐ যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং’।

05

-‘উঁ হুঁঃ, এখানেই তো হোঁচট খেলে তুমি। কসমোলজি বলছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্ষান্ত হয়েছে। কুমেরুর বরফ গলবে না, তুমি ভাসবে না।’

-‘ভাসবো না! ইয়ে, মানে, তবে যে খবরে, বইতে লেখা ছিলো!’

-‘স্রেফ ভাঁওতা। কখনও ভেবে দেখেছো, এই যে তুমি সারাদিনে তিরিশ খানা সিগারেট টেনে ধোঁয়া ওড়াও, সেটা কতো ক্ষতি করছে!’

-‘ঐ টুকুতে কিছু হয় নাকি?’

-‘এক্সাক্টলি। তেমনি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে পৃথিবী যে হারে গরম হচ্ছে, তাতে তুমি কেন, তোমার আগামী কুড়ি প্রজন্মও হেসে-খেলে টিকে যাবে।’

-‘তা হোক্। কিন্তু বললি না এখনও চ‍‍া কিভাবে দূষণ করছে?’

-‘ও তুমি বুঝবে না।’

-‘কি যে সব বলে!’

বাপিদা দোকানের ভেতর থেকে বলে উঠলো,’নাহ্! তোরা আর কেউ বড়ো হলি না। উল্টোপাল্টা কথাবার্তা সারাক্ষণ! ওদিকে দেখ্ আমার মতো চাওয়ালা প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলো! আমারও এবার একটা চেষ্টা করার দরকার অাছে। আর ভাল্লাগে না একদম এসব।’

বিলু ফিচ্ করে হেসে বললো,আগে লুঙ্গি সামলাতে শেখো, তারপর দেশ সামলাবে। কালই মিত্র বৌদির সামনে খুলে যাচ্ছিলো। অঘটন হতে বেশী সময় লাগে না। সাবধান হও।’

-‘পেছনে না লেগে এবার বিদেয় হ না বাপু। একটা সরকারি চাকরি জুটিয়ে বিয়ে-থা করে হিল্লে কর্। আর কদ্দিন শুধু আমাদের জ্ঞান দিবি?’

-‘সরকারি চাকরি? কে দেবে?’

04

-‘শুনলাম প্রাইমারির তো দশ লাখ রেট চলছে। কেন্দ্রের চাকরিও আছে। তোর কি টাকার অভাব? বাবাকে বল্ ডিসপেনসারিটা বেচে দিতে। পাক্কা একখানা চাকরি জুটে যাবে।’

-‘রক্ষে করো বাপিদা, ঐ যৌতুক আমার চাই না।’

-‘কেন? সমস্যা কী? আরে পুরো লাইফ সেট হয়ে যাবে। তারপর আনন্দ কর জীবনভর।’

-‘হ্যাঁ। এই আনন্দ লোকে নিতে যাচ্ছে বলেই তো চাকরির নিলাম হচ্ছে। সবাই দর লাগাচ্ছে। যার দর হাঁক বেশী, তার চাকরি।’

-মন্দ কী? এতো বছর তোকে খাওয়াবে, পরাবে, তোর ভরণপোষণ করবে, আর তুই তার আগে একটু খসাতে পারবি না!’

-‘না। পারবো না। এটাই তো সমস্যা। তুমি সুখ ভালোবাসো, নীতি নয়, স্রোত ভালোবাসো, সত্য নয়। তাই তুমি হাসিমুখে লাইনে দাঁড়িয়েছিলে ছ’মাস। বলতে পারো, তোমার টাকা তুমি নেবে তাতে চারঘন্টা লাইন কেন দিতে হবে তোমায়? চোর তো তুমি নও, আহম্মকও নও।’

-‘সে একটু মানিয়ে নিতে হয়, সবার ভালোর জন্যে।’

-‘তারপর? কি হলো? তোমার চারশো ঘন্টার ঘাম ঝরানো কালোটাকাওয়ালাদের চর্বি ঝরাতে পারলো কিনা জেনেছো?’

-‘নিশ্চয়ই হয়েছে। সবাই তো আর বোকা নয়!’

মুচকি হেসে বিলু বললো,’তোমারই বন্ধু তো ওমর। তাকে এপাড়ায় কেনো থাকতে দেওয়া হয়নি সেটা তুমি জানো না?
বাপিদা, উপেক্ষাটা কিন্তু সমাধান নয়। কিছুক্ষন আগেই বলছিল‍াম, চা দূষিত করছে আবহাওয়াকে, একটা চাওয়ালা করছে পুরো দেশটাকে।’

………..

বেশ অনেকদিন আর দেখা হয়নি বিলুর সাথে। শেষবার দেখা হয়েছিলো পুজোর পরে পরে। তখন জগতশুদ্ধু সামগ্রীর সাথে আধার লিঙ্ক করাচ্ছি। সেদিনও আমায় অনেক বাতেলা ঝেড়েছিলো। কিছু মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছিলো,তবু মনে আছে।
এখন আর বিলুকে দেখা যায় ন‍া এ পাড়‍ায়।
শুনেছি এখন নিজে ব্যবসা করে। শেষ অবধি হার মানলো না ছেলেটা।।

 

 

Photo Courtesy- raghukamath.com

ইন্টারভিউ (ভেতর দেখা)

এই ব্রম্ভান্ডের প্রতিটা প্রাণী কখনো না কখনো ইন্টারভিউ এর খপ্পরে পড়েছে। সংসারে আমাদের সবাইকেই হরবখত এই কাজটা করতে হয়। আমাদের ধারণা যিনি ইন্টারভিউ নেন তিনি সুপন্ডিত এবং অদৃশ্য এক হাঁড়ি প্রার্থীর মাথায় ভাঙার জন্য সদা প্রস্তুত। কুটিল কৌশলে তিনি বেমালুম,  প্রার্থীর কোষ্ঠী বিচার করেন।সুপ্রীম পাওয়ার থেকে জিরো আওয়ার সব তিনিই।
                    এ হেন কৌশলের মুখে ছাই দেওয়ার হরেক প্রচেষ্টা অনেকের সাথে আমিও করেছি। কিভাবে কর্তাদের পাল্টা চাপে ফেলে তার চক্রব্যুহ কেটে বেরিয়ে আসা যায় সেটা আয়ত্ত করাই মুখ্য। প্রথম ইন্টারভিউ তে গিয়েছিলাম একটা লিফট্ কোম্পানীতে, দলিল দস্তাবেজ নিয়ে প্রকান্ড হলঘরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ,বেরিয়ে আসা কয়েকজনের থেকে জানতে পারলাম গাড়ীর বৈদ্যুতিক নকশা নিয়েই বেশী প্রশ্ন হচ্ছে, এবং যে প্রার্থী যে গাড়ীতে চড়েছে তার প্রশ্ন সেই গাড়ী চেপেই আসছে। সুতরাং..
ঠিক করলাম আমাকে বাঁচাতে পারে একমাত্ৰ গরুর গাড়ী।

                      -আচ্ছা, অনিমেষ গুড মর্নিং। আপনি কোন কোন গাড়ী চড়েছেন?
সপ্রতিভ হয়ে বললাম , আমি গরুর গাড়ী ছাড়া কিছুতেই চাপিনি। 
খানিক টা আব গিলে তিনি বললেন, কলকাতায় এলেন কিভাবে? 
-কেনো হেঁটে হেঁটে ….
 এবার তিনি বললেন, আচ্ছা আপনি ট্রেন দেখেছেন?

 বললাম হু দেখেছি “পথের পাঁচালী” সিনেমাতে , কাশ বন দিয়ে দৌড়াচ্ছে ….
উনি বললেন , টিভিতে দেখেছেন?  
বললাম, না টিভিতে নয় খবরের কাগজের ছবিতে। 

(মনে মনে ভাবছি একে ইলেকট্রিক এর কিছু দেখেছি বললেই আমার সাড়ে সতেরো অবস্থা হবে)
 উনি এবার বললেন , আচ্ছা  এই টিউবলাইট টা সুইচ অন করলে কিভাবে কাজ করছে ?  
আমি বললাম , ইলেকট্রিক সার্কিট সম্পূৰ্ণ হয়েছে তাই।

এটা শুনে আমার মাথায় হাঁড়ি ভাঙ্গার উচ্ছাসে বলেই ফেললেন ….আচ্ছা ইলেকট্রিক কি ?

( ডুবে যাবার আগে ,বাঁচার অন্তিম চেষ্টা ….মনস্থির করলাম , এ চাকরী আমার জুটবেনা। সপ্তবর্ষব্যাপী চলা এই যুদ্ধের ইতি টানবো এবার )

আমি বলেছিলাম , পৃথিবীতে এখন সবকিছু নকল . তবুও খাঁটি জিনিষ পাওয়া যায় , সেই খাঁটি জিনিষটাই এই ইলেকট্রিক।
 মুচকি হেসে বলেছিলেন , খাঁটি যে কি করে বুঝবো ?
মুখের হাসি চওড়া করে বলেছিলাম , হাতে নিয়ে পরখ করে দেখুন। 

তবেই খাঁটি ইলেকট্রিক বুঝতে পারবেন।
শেষে এটাই বলেছিলেন , কোন কলেজ থেকে পাশ আউট ??

পুনর্মিলন

বাইরে আইসক্রিমওয়ালার ‘টিং-টিং’ শব্দে এক লহমায় ঘোর কাটলো ভুজঙ্গবাবুর। বেশ আয়েস করে ইজিচেয়ারে নিজেকে বিস্তৃত করে নিজের পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির কথা ভাবছিলেন, হতচ্ছাড়াটা সব মাটি করে দিলো। ভুজঙ্গবাবুর পরিবার বলতে তিনি এবং তিনি নিজেই। এই একান্ন বছর বয়সেও তিনি গর্বিত ব্যাচেলার। তিনকুলে তাঁর কেউ নেই, যাঁরা আত্মীয় পরিজন রয়েছেন, কেউ তাঁর ধারেকাছে ঘেঁষেন না। লোকটি মারাত্মক বদরাগী এবং ততোধিক কৃপণ। এক্সট্রা খরচার ভয়ে তিনি বিয়েই করেননি। এমনকি প্র্যাক্টিক্যালের খরচা আলাদা দিতে হবে শুনে কলেজে ভর্তির সময়ে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ছেড়ে অঙ্কেই নিজেকে টেনে ঢুকিয়েছিলেন। তাঁর বাড়ীতে কোনও কাকপক্ষীও আসে না। মোদ্দা কথা হলো, তিনি নিজে ব্যতিত জগৎসংসারের আপামর প্রানীকুল তাঁর উদার মনোভাবের বিষয়ে অবগত ছিলো। পাড়ায় পুজো-টুজো হলে তাঁর কাছে কস্মিনকালে চাঁদা চাইতে কেউ আসতো না। তাতে অবশ্যি তাঁর কোনওরকমের অভিযোগ ছিলো না, উপরন্তু খুশি হতেন। সাতে-পাঁচে নিজেকে না জড়িয়ে কুপমন্ডুক ধনী হওয়ায় অনেক বেশী সুখ। 

এহেন ভুজঙ্গবাবু আইসক্রিমওয়ালার ঘন্টার শব্দে তেড়েফুঁড়ে উঠে বসে অপার খিস্তাচ্ছেন, এমন সময়ে দরজায় ‘খট্-খট্’ আওয়াজ। এক নিঃশ্বাসে একগেলাস জল খেয়ে মেজাজ খিঁচড়ে দরজা খুলতেই এক প্রাপ্তবয়স্ক লোক সামনে দাঁড়িয়ে।
– নমস্কার, আপনিই ভুজঙ্গবাবু?
– হ্যাঁ। কি চাই?
– আজ্ঞে, একটু কথা ছিলো। ভেতরে আসতে পারি?
নিমেষে কুন্চিত ভ্রু নিয়ে ভুজঙ্গবাবু ভাবলেন, কাউকে বিশ্বাস করা যায় না আজকাল। তাঁর এই এত্তো বছরের জমানো ধনসম্পদ যদি ব্যাটা লুটে নিয়ে পালায়, তাহলে তাঁর রেপুটেশন যথার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
– না, যা বলার ওখান থেকেই বলুন। আর, কিছু বল‍ার না থাকলে ভাগুন।
– না, মানে, একটু পরামর্শের দরকার ছিলো। আর, ‍অাপন‍ার চেয়ে অভিজ্ঞ মানুষ এ পাড়ায় আর কে আছে বলুন?!
গোঁফটাকে সরলরেখা বানিয়ে মুচকি হেসে খানিক গর্ব বোধ করলেন ভুজঙ্গবাবু। এতোকাল নিজের সম্বন্ধে সবার মুখে গালিগালাজ ব্যতিত আর কিছুই শোনেননি। যদিও ধনাত্মক বিশেষণের অভাব তাঁর অন্তর্সত্ত্বার কিপ্টেমিকে তিলমাত্র ক্ষুণ্ন করতে পারেনি, তবুও, প্রথমবার নিজের সম্বন্ধে অন্যের মুখে ভালো কিছু শুনে বেশ লাগলো তাঁর।
– আসুন ভেতরে। তবে, জুতো খুলে। আমি মাসে একবারই এই ঘরের মেঝে পরিষ্কার করি। কালই করেছি।
– আপনি যা বলবেন।
মধ্যবয়স্ক লোকটি ভেতরে এসে সোফায় বসলো। কথা প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, ভুজঙ্গবাবুর সোফাটি তাঁর এক মাসি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন বছর কুড়ি আগে। তিনি খুব ক্ষিপ্ত হন্, তাঁর মতে একটি খাটিয়ার ওপর যখন বসা, শোয়া, পড়াশোনা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ সম্পাদিত হতে পারে, তখন সোফা কিনে ফালতু খরচার কোনও অর্থ নেই।


ভুজঙ্গবাবু বলে উঠলেন,
– হ্যাঁ। তা, মহাশয়ের কি কাজে আসা হয়েছে?
– বলছি। তার আগে অতিথি আপ্যায়ন করুন। প্রথমবার আপনার বাড়ীতে এলাম। চা-মিষ্টি কিছু দেবেন না?
– আপনি খুব হ্যাংলা, মশাই! এভাবে সামনে থেকে কেউ চায়?
– না। মানে, ভাবলাম, এতো বিশাল অর্থভান্ডারের দায়িত্ব আপনাকে দেবো, আর আপনি আমায় এককাপ চা খাওয়াতে পারবেন না?!
– কোন অর্থভান্ডার? একটু খোলসা করে বলবেন?
– বলছি। আগে চা টা পাই! এতোটা রাস্তা হেঁটে ঘেমে গিয়েছি। শরীরটা একটু জুড়োই। তারপর বলছি।
– চায়ে চিনির প্রয়োজন নেই তো?!
– বলেন কি?! চিনি ছাড়া চা ইজ লাইক ফুটো ছাড়া টাইটানিক।
– মানে, চিনিটাও জোগ‍ান দিতে হবে।
– আলবাৎ।
মিনিট তিনেকের মধ্যে গরম চা এনে হাজির করলেন ভুজঙ্গবাবু।
– আজ্ঞে, বিস্কুট?!
– তার কথা তো হয়নি।
– সব কি আপনাকে বলে দিতে হবে মশাই?! অতিথি সৎকার বোঝেন না? আপনি এত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি।
– আনছি। একটা?
– উঁহু! তিনটে।
কটমট করে খানিকক্ষন ত‍াকিয়ে বিস্কুট আনলেন ভুজঙ্গবাবু।
– ধন্যবাদ। সিগ্রেট পাওয়া যাবে?
– ধূমপান করি না। উপরি খরচা হয় তাতে।
– ও হ্যাঁ! আপনি তো আবার ব্রেকফাস্টও করেন না।
– আপনি জানলেন কিভাবে?
– জানি। জানি। পাড়ার লোকেদের মুখে শুনেছি। আপনার মতো হাড়কেপ্পন লোক পুরো ভারতবর্ষে দুটি মেলা ভার।
– হুম। সে যাই হোক। দু’বেলা পেট ঠুসে খাই। মাঝখানে আর খুচুর খুচুর চপ, কেক, মুড়ি ইত্যাদি খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। খরচা বাঁচে। কিন্তু আপনি কি জন্যে এসেছেন সেটা বলবেন? কোন বিপুল অর্থভান্ডারের জন্যে কি ব্যাপার বলুন।
– বলছি। উতলা হচ্ছেন কেন? ধৈর্য্য রাখুন। এতো বদরাগী মেজাজ ভালো নয়। নিউজ চ্যানেলে বলে, হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, কিংবা ধরুন নিউমোনিয়া।
– নিউমোনিয়া?! আপনি তো মশাই মূর্খও বটে।
– তা বলতে পারেন। এই অধমের জ্ঞানগম্যি যথাসম্ভব স্বল্প।
– চা তো শেষ হতে চললো। এবার তো বলুন।
– আপনি প্রতিদিন সকালে মর্নিং ওয়াকে যান। কিংবা ধরুন, মাঝে মধ্যে পার্কে, বাড়ীর ছাদও তো রয়েছে, সেখানে গিয়ে বসুন।
– তাতে কি উদ্ধার হবে?
– হৃদয় সতেজ হবে।
– আমার হৃদয় যথাসম্ভব সতেজ রয়েছে এবং থাকবে। হুলোমার্কা নজর দেবেন না।
– ছি..ছি..নজর দেবো কেন?! আপনার জন্যে খুব চিন্তা হয়।
– আপনি আবার কোন্ শুভাকাঙ্ক্ষী এলেন?
– জাভেদকে মনে আছে স্যর?
– নাইন্টি সেভেন?
– হ্যাঁ স্যর। আপনার তো মনে আছে দেখছি।- কিভাবে ভুলবো বল্?! তোদের কতো পিটিয়েছি। হতচ্ছাড়া সব। তা অ্যাদ্দিন পর কি মনে করে?!
– আমার মেয়েটাকে পড়াতে হবে স্যর। খুব বিচ্ছু। জানি, আপনি প্রাইভেট টিউশন দেন না। তাই রিকোয়েস্ট করছি স্যর। আপনি ছাড়া ওকে আর কেউ অঙ্ক বোঝাতে পারবে না।
– বটে?
– আসবেন তাহলে?
– যাবো যাবো।
– আজ তাহলে উঠি স্যর।
– আয়।
– সরি। আপনার চা-বিস্কুট মিলে অনেক খরচা করিয়ে দিলাম।
– বেতনে অ্যাডজাস্ট করে নেবো।
– (মুচকি হেসে) আসছি স্যর।

(ইলাস্ট্রেশন- http://www.clipartof.com)

Q-ফেলু

collage_fotor

 

– খবরের কাগজের বক্তব্য কি আজ? রসালো কিছু আছে নাকি লালমোহন বাবু?
– কেন বলুন তো মশাই? কিছু আন্দাজ করছেন নাকি?
– না…মানে আজকাল সবই কমপ্লেক্স তো! তাই গাছের পাতা খসলেও হেডলাইন হতে বেশি সময় লাগে না।
– হুম…একখানা দারুন নাম মনে করালেন মশাই! নেক্সট গল্পটায় একটু হাস্যকর অ্যাপ্রোচ রাখছি। নামটা পারফেক্ট হবে। “হেডস্যরের হেডলাইন”! বাঃ…আপনি নিঃসন্দেহে জিনিয়াস!
– বলেন কি?! লোকে তো মানিকবাবুকে খিস্তি করছে! এইরকম অপদার্থ ক্যারেক্টার সৃষ্টি করার জন্যে!
– অ্যাঁ…ইয়ে…মানে…কবে…??? কে…??? কিভাবে…??
– জানেন না?

ও…আপনি তো আবার স্যোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটেও নেই! লালমোহন বাবু, মানুষ চাঁদে পৌঁছে গেলো, আর আপনি এখনও শুধু কাগজ, কলম আর হার্ডকপিতে আটকে রয়ে গেলেন!
– ওফ…লেগপুলিং বন্ধ করুন তো মশাই! টপিকে আসুন। সেই মহান ব্যক্তিটি কে?
– ঐ, একজন স্বনামধন্য বাংলা চিত্রপরিচালক। তিনি সন্দীপের লাস্ট ছবিটা দেখে আমায়, তপেশকে, এমনকি মানিকবাবুকেও খিস্তি করেছেন। আপনি বয়েঃজ্যেষ্ঠ। তাই আপনার সামনে খিস্তিগুলো বললাম না।
– হাইলি সাশপিশাস!!! কোনও রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন নাকি?
– আমি না পেলেও…মিডিয়া কোনও ষড়যন্ত্রের গন্ধ অবশ্যই পেয়েছে। ওদের নাক কুকুরের থেকেও বেশি সেনসিটিভ! আজকাল তো একটা মশা মরলেও ওরা শ্রবণশক্তি আর হস্তযুগলের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেয়।
– কিন্তু এই অপমান! মানে…বাঙালি কোনও প্রতিবাদ করলো না?
– করেছে…করছেও…তর্জনীর খোঁচায় চল্লিশ-বেয়াল্লিশ জনকে ট্যাগিয়ে প্রতিনিয়ত বিপ্লবী আন্দোলন চলছে ফেসবুকে, ট্যুইটারে।
– আর আপনার কি মতামত? মানে, আপনারই তো সম্মান ওষ্ঠাগত হওয়ার কথা!
– আমি কি আর আমি আছি, লালমোহন বাবু?! আমি জন্মেছিলাম ছিন্নপত্রে, এলাম বাইন্ডিং করা বইতে। তারপর রূপোলী পর্দা, তারপর সোনালী পর্দা…প্রতিনিয়ত অস্ত্রোপচার হয়ে চলেছে আমার ওপর। বাঙালি তো আজকাল ফেলু মিত্তির বলতে গোল্ডেন স্ক্রিন, সন্দীপ রায় আর সব্যসাচীকেই বোঝে। আমি কোথায়? তিনি তো ঐ পোস্টমর্টেম করা ফেলুকেই গালাগাল করেছেন। আমায় নয় তো!
– কথাটা সত্যি বটে! আচ্ছা আমরা কি পুরোটাই ভার্চুয়াল?!
– অনেকটাই…তবে পুরোটা নয়।
– পুরোটা নয় কেন?
– লালমোহন বাবু, এখনও বইমেলায় অনেকে খাবারের স্টলের বদলে বইয়ের স্টল প্রেফার করে।

 

(মানিকবাবুকে…………)

26/11

– এতক্ষণ কি খুচখুচ করছিস মোবাইলে?

– ঝিঙ্কু একখানা স্টেটাস দেবো ফেবুতে, ভাবছি কি দেবো। 

– কেন? আজ কোনো প্রেমের গপ্পো পড়লি নাকি?

– আরে না..না..কি যে বলো…

– তবে?

– আজ অ্যানিভার্সারি না?!

– কিসের?

– ঐ যে, মুম্বই অ্যাটাকের!

– ও…হ্যাঁ..আজ তো ওটাই ট্রেন্ডিং! তা কিছু বেস্ ঠিক করলি? 

– মানে?

– মানে, পাকিস্তানকে খিস্তি দিবি নাকি ইসলামকে?

– ইয়ে…ওই ব্যাপারেই একটু ঘেঁটে আছি।

– কেন? তখন তো গলা ফাটিয়ে আইডিওলজিস্টদের সাথে গলা মেলাচ্ছিলি..”ইসলাম মুর্দাবাদ”! আজ নেতিয়ে পড়লি?!

– নেতিয়ে পড়িনি…ওই একটু ইতস্ততঃ বোধ করছি। ধর্মের ব্যাপার তো!

– আচ্ছা?! তাই না?! ইসলামে কি এই খুনগুলোর সুপারি দেওয়া ছিলো? কি মনে হয় তোর?!

– না..মানে..ওরা আর কি পারে বলো?! আমাদের পুরো নগ্ন করে দিলো!

– আচ্ছা..তুই তাহলে ঐ আবরনের কাপড় খুঁজছিস?

– আমি যুদ্ধ চাইছি! কোরানকে তার যোগ্য জবাব দেব!

– কার্গিল পার্ট টু?! তা এই যুদ্ধের লক্ষ্য কি হবে? কোরানের মৃত্যু ?

– হুম..আমরাই শ্রেষ্ঠ!

– ও..তা বটে…তুই তো রীতিমতো ঐ সেলিব্রিটিদের মতো দাবি করছিস!

– কোন সেলিব্রিটি?

– ঐ যে, যারা আমাদের নয়, মনুষ্যত্বকে নগ্ন করেছিলো, ইসলামকে ছিঁড়ে ফেলেছিলো…ঐ বোটে আসা মানুষখেকো বর্বরগুলো…যারা ধর্মের এক শতাংশ বুঝলেও আল্লাহ্ বলতেন “মোগ্যাম্বো খুশ হুয়া”!

(চিত্র সংগৃহিত)

নোটব্যান


– নোটব্যান সাপোর্ট করছেন তাহলে?
– বিলক্ষণ! এই না হলে দেশ! কোরাপশন ফ্রি, ব্ল্যাকমানি ফ্রি, দুর্দশা ফ্রি, পুরো স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন চিন্তাভাবনা। আবার আজকাল তো ইন্টারনেটও ফ্রি! সত্যি মশাই, অনেকটা আমেরিকাকে টক্কর দিচ্ছি আমরা।

– ওবামা সমর্থন করছেন তাহলে?

– ওবামা কি মশাই! ওবামার বাবা-মা সকলে সমর্থন করছেন। আমাদের প্রেসিডেন্টের সাথে কোলাকুলির সিনটা দেখেননি?!

– কিন্তু সে তো নোটব্যানের অনেক আগে!

– আহ্! মোদ্দা কথা হল তিনি আমাদের দেশের পাশে আছেন। আরে তিনি তো বটেই, ট্রাম্পসাহেব ও আমাদের পাশে আছেন। আমাদের চারিদিক থেকে বেষ্টন করে আছেন। ‘ক্যুইটার’ দেখেন না?! ওখানেও অনেকে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন।

– না…আসলে ওইসব এই বয়সে আর..মানে…

– এই হলো মশাই আপনাদের বদরোগ! দেশের তাবড় তাবড় শিল্পপতিরা বিনি পয়সায় ইন্টারনেট দিচ্ছে, দেশ চেঁচাচ্ছে ‘ডিজিট্যাল হও..ডিজিট্যাল হও’, আর আপনারা এখনও বোকাবাক্স আর খবরের কাগজের বাইরে বের হতে পারলেন না! আরে…আমরা সেই দেশ, যারা কিছুদিন আগে মঙ্গলে পৌছোলাম!

– তা বটে, তা বটে! বেড়ে কাজ করছে মশাই আমাদের দেশ! কিন্তু বলতে পারেন, ঐ ফুটপাথের হাড়গিলে কঙ্কালগুলোর কি হবে? ওগুলো কি কোনোদিন চামড়া-মাংস পাবে না?!

– আরে মশাই…ওটা টাইমের ব্যাপার। ওগুলো নন্ প্রফিটেবল ইনভেস্টমেন্ট, বুঝলেন কিনা! ইকনমিক্স বোঝেন তো? ওগুলো সুরাহা করতে কেউ পা বাড়াবে না। এই রোবোটের যুগে থাক কিছু জ্যান্ত রোবোট!

– হুম..প্রোভার্টি ইজ আওয়ার ক্লোথ অ্যান্ড হাঙ্গার ইজ আওয়ার ফ্যাশন!

– কারেক্ট…নো সন্দেহ।

– এই যে…আমার বাস আসছে। আরে..বাই দ্য ওয়ে…অাপনি কি করেন?

– আমি টিউশনি পড়াই..প্রাইভেট টিউটর। আর আপনি?

– আজকাল ব্যাঙ্ক আর এটিএমের বাইরের লাশগুলো গুনছি…

চললাম…

(চিত্র ইন্টারনেট হইতে সংগৃহীত)

ইচ্ছেপূরণ

Dead body in a mortuary

 

 

একুশ বছর স্ত্রী,পুত্র,বন্ধুবান্ধব,আত্মীয় পরিজনদের গুরুভার বয়ে বেড়ানোর পর হঠাৎই একদিন ব্যালেন্স হারিয়ে হার্ট অ্যাটাকে গত হলেন মলয়বাবু। একরকম মরেই বাঁচলেন বলা যেতে পারে। রোজকার অফিসে বকুনি, স্ত্রী-র বকুনি, বাচ্চার আবদার ইত্যাদি ইত্যাদি হজম করতে গিয়ে, ‘অর্থ’ নামক উৎসেচকের অভাবে পকেট এবং অন্তরাত্মা উভয়ই গড়ের মাঠ। চড়ুইপাখি সাইজের স্যালারির ওপর নির্ভর করে বাড়তি আভিজাত্য দেখানো সম্ভবপর নয়, তা তিনি বহুপূর্বেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তথাপি অর্ধাঙ্গিনীর রক্তচক্ষুর ভয়াবহতা আন্দাজ করে শ্বশুরবাড়ীর রাজকীয় লাইফস্টাইল কপি করতে করতে আপাদমস্তক দেনায় ডুবে তাঁর পরিস্থিতি বড়োই সঙ্গীন ছিলো।

আগেও তিনবার হার্ট অ্যাটাক তাঁর দরজার কড়া নেড়ে গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই আক্রমনগুলিতে স্বর্গদর্শনের সৌভাগ্য হয়নি মলয়বাবুর। এবার হয়তো পরমাত্মা তাঁর কাকুতি-মিনতি শুনতে শুনতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই স্ট্রেট ড্রাইভে উতরে গেলেন।

মৃত্যুর পর অবশ্য তাঁর স্ত্রী গলা ফাটিয়ে কান্না জুড়েছিলেন। দেখে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। উপরন্তু, সোনাই ফ্যালফ্যাল করে একবার তার মায়ের দিকে, একবার মলয়বাবুর মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে কিছুই ঠাওর করতে না পেরে আকাশপাতাল ভাবছিলো। সোনাইয়ের চোখের কোণায় একটু জলের চিহ্ন দেখে খানিক কষ্ট হচ্ছিলো মলয়বাবুর। শেষবারের মতো ক্ষমাও চাইতে পারলেন না। আর বেশীক্ষন তিনি এসব দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে স্বর্গলোকে আসন্ন অ্যাডভেঞ্চারের কথা ভাবতে ভাবতে সময় কাটিয়ে দিলেন।

 

he ma matajiiiiiiiiii   !!!!!!!!!!_Fotor

 

 

প্রায় ঘন্টাদুয়েক পর কান্নার শব্দগুলো বন্ধ হলো। চোখের সামনে এক কিম্ভুতকিমাকার প্রাণী এসে কিছুটা কিডন্যাপ করার স্টাইলে তাঁকে তুলে নিয়ে গেলো।

 

খানিক নীরবতা।

 

চোখ খুলে দেখলেন, সাক্ষাৎ ‘স্বর্গউড’-এর গব্বর সিং! যমরাজ! চিনতে ভুল হলো না। ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ তাঁর ঠোটস্থ! করজোড়ে নমস্কার জানালেন মলয়বাবু।

 

jomraj_Fotor

 
– মলয়বাবু, আফটারলাইফে স্বাগতম। মর্ত্য ছেড়ে কেমন লাগছে।
– দারুন! মাচ্ সিকিওর্ড!
– স্ট্রেঞ্জ! আপনি খুশি হচ্ছেন?
– সে আর বলতে! কয়েকহাজার প্রেশর থেকে রিলিফ। আর তাছাড়া, যার ধর্মতলা অবধি যাওয়ার বাজেট নেই, নিখরচায় একেবারে পৃথিবীর বাইরে ট্যুরে এলে খুশি তো হবেই।
– তা ঠিক, তা ঠিক! যাক গে, এখন বলুন এখানে আপনার সেবায় আমি কি করতে পারি?
– মানে? ঠিক বুঝলাম না। আপনি আমার চাহিদা পূরণ করবেন?
– নিশ্চয়ই! গেস্ট বলে কথা! তা ও আবার টেম্পোরারি।
– ইয়ে, এরপর কোথায় পাঠাবেন, জানতে পারি?
– ডিসকাশন্ চলছে। তবে আর মিডল ক্লাস ফ্যামিলিতে যাচ্ছেন না।
– হোয়াট? মানে, আমাকে আবার মানুষ হয়ে জন্ম নিতে হবে? প্লিজ, নট্ এগ্যেইন!
– দেখুন, এ জন্মে আপনার পাপের বোঝা নগণ্য। তাই ওপরমহল থেকে এই ডিসিশন নেওয়া হয়েছে।
ওসব ছাড়ুন, বলুন আপনার এখানে রিকোয়ারমেন্ট কি কি?
– বলছি, তার আগে আপনি বলুন তো, আগের তিনবার হার্ট অ্যাটাকের বেলা আপনি আমায় নিতে আসেননি কেন?
– শুনুন মলয়বাবু, আপনার জীবনের টানাপোড়েন, দুঃখ, একাকীত্ব কোনোটাই আমার অজানা নয়। কিন্তু আমাকেও আইনের সীমারেখার মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। ওপরমহল থেকে আমায় তখন কোনও অর্ডার দেওয়া হয়নি। কিন্তু এবার আর ওঁরা সহ্য করতে পারেননি। তাই ওঁদের কথায় আমি আপনাকে এখানে নিয়ে আসি। এখানে আপনি খুশিতে থাকতে পারেন। কারণ, মর্ত্যের মতো নাটুকে সমাজ আপনি এখানে পাবেন না।
– একটা রিকোয়েস্ট করতে পারি?
– বলুন।
– আপনি বলেছিলেন, আমার চাহিদা পূরণ করবেন। প্লিজ, পরের বার আমায় পৃথিবীতে মানুষরূপে জন্ম দেবেন না।
– কি বলছেন, মলয়বাবু?
– ঠিকই বলছি। আমার এই ইচ্ছেটি পূরণ করে দিন, যমরাজ। এখানে আমার কিছুই চাই না। পরের বার পৃথিবীতে আমি সারাদিন রোদের পাতায়, কিম্বা মাঠের আলে, বাতাসে, জলে, মাটিতে মিশে থাকতে চাই। অর্থ, অনর্থ, সম্পর্ক, আভিজাত্য, ছদ্মবেশ, সবকিছুর আড়ালে প্রকৃতির কোলের আদর গায়ে মেখে বাঁচতে চাই। আপনি আমায় সাহায্য করবেন তো?
– মলয়বাবু, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করবো ওঁদের রাজি করানোর। বাকিটা ওনাদের ইচ্ছে। তবে, ওনারা রাজি না হলে, প্লিজ, আপনি ভেঙে পড়বেন না। এই যাত্রা খুব কঠিন।
– আপনি চেষ্টা করবেন তো?
– কথা দিলাম!

 

 

 

 

শুনেছি, মলয়বাবু পরের বার একটি গাছের ডালে জন্ম নিয়েছেন। তবে, শেষরক্ষা হলো না। তিনমাস পর এক জহ্লাদ এসে তাঁকে খাঁচায় বন্দী করলো। তারপর, এ খাঁচা থেকে ও খাঁচা….যাত্রাটি সত্যিই খুব কঠিন॥

প্রত্যাবর্তন

রবি ঘোষ

– হ্যালো!

– মানিকবাবু?

– বলছি! আপনি?

– সে না হয় একটু পরে বলছি। আগে বলুন, কেমন আছেন? মানে…ইয়ে..মর্ত্যের মায়া ছেড়ে তো অনেকদিন হয়ে গেলো!

– দিব্যি আছি। গুণীজনদের সাথে সখ্যতা রয়েছে। আনন্দেই কাটাচ্ছি।

– আর কিছু প্রোগ্রেস?

– হুঁ..’ফেলুদা ইন আফটারলাইফ’ একটা উপন্যাস অন দ্য ওয়ে। প্রায় শেষ হয়েই এসেছে। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হচ্ছে। অবিশ্যি, এখন থেকেই ‘ভূতবুক’, ‘ভূতস্টাগ্রাম’ এইসমস্ত স্যোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটেও প্রচার চালাচ্ছি। আশা করি ভালোই বিক্রিবাটা হবে।
বাই দ্য ওয়ে, আপনি কিন্তু আপনার নাম বললেন না।

– নিশ্চয়ই বলবো। এতো তাড়াহুড়ো কিসের?
তা বলছি, ‘গুপি-বাঘা’ নিয়ে কিছু ভাবলেন?

– চিন্তা চলছে। দর্শকদের ডিমান্ড, এবার গুপি-বাঘাকে একটা নতুন লুক্ দিতে হবে। যেমন ধরুন, গুপির পরনে ফেডেড জিন্স ও টি-শার্ট, বাঘার পরনে ক্যাজুয়াল টি-শার্ট এবং হাতে গিটার!

– বলেন কি মশাই? পাবলিক খাবে তো?

– আলবাৎ খাবে। কেন মশাই? অড লাগছে?

– তা তো একটু লাগছেই। মানে দেখুন, তামাম বাঙালী এতোদিন খোলধারী বাঘাকেই চিনে এসেছে। তা, এই ইম্প্রোভাইজেশন বাঙালীর সইবে তো?

– আগে আপনি কে বলুন তো মশায়!

– বলবো, বলবো। ধৈর্য ধরুন। আচ্ছা, ‘সোনার কেল্লা’ ছবিটার রিমেক করলে কেমন হয় বলুন তো?

– রিমেক?

– আজ্ঞে! যেমন ধরুন, ‘সোনার কেল্লা ২’ অথবা ‘আর একটি সোনার কেল্লা’!

– সে দেখা যাক। বাট্, আপনি এতো ইন্ট্রেস্টেড কেন?

– রোলটা পাওয়ার জন্য। বাঙালীর চোখে আর একবার ধরা দেওয়ার জন্য। হাতে গোণা কয়েকজনের গন্ডি ছাড়িয়ে আরও একবার খানিকটা বিস্তৃত হওয়ার জন্য।

– আপনি কে বলুন তো?

– আজ্ঞে রবি ঘোষ বলছিলাম স্যর!

(রবি ঘোষ স্মরণে…….)

সদুপদেশ

conversation_002

– তোর দ্বারা কিস্যু হলো নাহ্!

– কেন ছোটকা? এই তো সদ্য চাকরি পেলাম। পাঁচ অঙ্কের স্যালারি। নেহাত খারাপ নয়।

– চাকরি পেলেই সব হয়ে গেলো? গাধার মতো খাটার একখানা লাইসেন্স পেলি, এই যা!

– একটু খোলসা করে বলবে, কি বলতে চাইছো?

– ফ্ল্যাশব্যাকে যা। কিছু দেখতে পাচ্ছিস? একটা ছোট্ট মিষ্টি ছেলে, ছোটকার সাথে খেলছে, পার্কে যাচ্ছে, ছোটকার থেকে টাকা নিয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে। কিছু দেখতে পাচ্ছিস? আবছা?

– বুঝলাম ছোটকা। কিন্তু, পয়েন্ট টা কি?

– পয়েন্ট টা হচ্ছে এই যে, এই রিসেশনের যুগে ইঁদুরদৌড়ে অংশগ্রহন করে একখানা মাথাগোঁজা চাকরি জুটিয়ে নিলেই তোর জীবন সম্পূর্ণ নয়। তুই জানিস, তোর লাইফে কোন ইয়ে নেই!

– এই ‘ইয়ে’ টা কি, শুনি?

– এক্সাইটমেন্ট, জয়নেস্, ক্রিয়েটিভিটি এইসব ইয়ে। মানে, খানিকটা লাগামছাড়ানেস্। ইউনিভার্সিটি থেকে পাস-আউট করার পর তো কোনোদিন তোকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেও দেখলাম না! আর, প্রেম-টেম ও তো করিস না। এমন চেপে-চুপে বেঁচে থাকলে কি আর তাকে মানুষ বলা চলে? নো এক্সাইটমেন্ট, নো থ্রিল!

– হুম্….তোমার কাছে সবচেয়ে সিম্পল থ্রিল কি?

– থ্রিল তো অনেক প্রকারেরই হতে পারে। যেমন ধর, রাত্তিরবেলা সকলে ঘুমিয়ে রয়েছে। সেই সুযোগে তুই ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম নিয়ে পুরোটা সাবাড় করে দিলি। সকালে কেউ আইসক্রিমের খোঁজ করলে পরিপাটি করে সম্পূর্ণ ঘটনাটাকে অস্বীকার করে গেলি।

– এক মিনিট…এই আইসক্রিমের পরিবর্তে রসমালাই হলে কেমন হয়? মানে…বহুদিন অভ্যাস নেই তো, তাই আইসক্রিম ঠিক..মানে…জমবে না আর কি।

– রসমালাই? ওকে…বেটার অপশন্! কিম্বা জলভরা হলে কেমন হয়?

– টেম্পটিং!

– গ্রেট! কিম্বা পিওর রসগোল্লা!

– এক মিনিট, ছোটকা। আলোচনাটা ক্রমশ মিষ্টান্নের দিকে ইনক্লাইন্ড হচ্ছে। টপিক হারিয়ে ফেলছি আমরা।

– ওরে গাধা, এটাই তো প্রাইমারি লেভেল অফ লাগামছাড়ানেস্!

পার্ফেকশন্

man-thinking-drawing-thinking-man-very-catching-black-white-photo-illustration-featuring-white-marble-statue-concerned-upset-32482638

– পারফেক্শন বোঝেন?

– পলিউশন্ বুঝি। প্রতি দশ হাত অন্তর অন্তর আপনার মতো এঁচোড়ে পাকা পারফেক্শনিস্ট উঁকি মারে। টু হার্ড টু ট্যাকল আউট!

– আরে মশাই, টপিক চেঞ্জ করছেন কেন?

– উঁ হুঁ! টপিক চেঞ্জ করছি না। বরঞ্চ বলতে চাইছি যে, শুধু দু-চারটে হুলোমার্কা গপ্পো, কবিতা লিখলেই পারফেক্শনিস্ট হওয়া যায় না!

– তবে আমি পারফেক্শনিস্ট নই?

– এক্কেবারেই না! আপনার গল্প আর, কবিতাগুলোয় অ্যাবস্ট্র্যাকশন্ অনেক বেশী। ওই, মেগা সিরিয়ালের টি.আর.পি. র মতো। কাহিনী কিস্যু নেই, অথচ অডিয়েন্সের ছয়ালাপ। আর, অ্যাবস্ট্র্যাকশন্ এতো বেশী পরিমানে থাকলে ঠিক জমে না। মানে, পপুলারিটি থাকলেও পারফেক্শন এক্কেবারেই নেই।

– বলেন কি? রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ, প্রায় সকলেই কবিতায় অ্যাবস্ট্রাকশন্ চালিয়ে এসেছেন। তাঁদের কবিতাকে আপনি অগ্রাহ্য করছেন?

– এই তো, চারিদিকে অশিক্ষা! ওনাদের কবিতাগুলো ইম্যাজিনেশন, নট্ অ্যাবস্ট্র্যাকশন।

– মানে? ইম্যাজিনেশন আর অ্যাবস্ট্র্যাকশনের ফারাক কোথায়? দুটো তো একই ব্যাপার।

– একই ব্যাপার? রাঙালু আর শাঁখালু একই জিনিস? বেসিক ডিফ্রেন্সও বোঝেন না?

– তবে আপনিই বলুন!

– হুঁ..তা তো বলবোই। সাহিত্যের এমন অপমান তো আর মুখ বুজে সহ্য করা যায় না! যাই হোক, দেখুন, ইম্যাজিনেশন খানিকটা থিঙ্কিং এবং খানিকটা রিয়্যালিটির জগাখিচুড়ি। বাট্, অ্যাবস্ট্র্যাকশন্ ইজ কপ্লিটলি আনরিয়্যাল। যার মধ্যে বাস্তবতার ছিঁটেফোঁটাও নেই। মানে, ভার্চুয়ালিটির এক্সট্রিম স্টেজ আর কি! তাই, অ্যাবস্ট্র্যাকশন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গেলে বিস্তর জ্ঞানগম্যি ও দক্ষতার দরকার হয়, যেগুলির অস্তিত্ব আপনার চড়ুইপাখি সাইজের দু’এক ফোঁটাও নেই।

– হুঁ..বুঝলাম।

– কি বুঝলেন?

– রবীন্দ্রনাথ ও সুকুমারের মধ্যে পার্থক্যটা বুঝলাম।

(Illustration collected from- clipartpanda.com)