বাঙালীর বর্ষাকাল মানেই ছাদে বা রাস্তার মাঝখানে ধেই ধেই করে নৃত্য করা, সর্শে ইলিশ, খিচুড়ি আর নাকে তেল দিয়ে ঘুম। অবশ্য এই মরসুমে ছাত্রদের ও চাকুরীজীবীদের খুব চাপে থাকতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও এর শিকার। রাত্তিরবেলা বৃষ্টি হয়ে গলিটা নদীতে পরিণত হলেও ভোরবেলা প্রিয় বিছানা ছেড়ে কোচিং-এ যাওয়ার জন্য মা তাড়া লাগালে অসম্ভব অনীহা নিয়ে কোনওমতে উঠে ব্রাশ করে ঐ নদীর মধ্যে দিয়ে ফুলপ্যান্টকে জাঙিয়া করে নিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় লাগাতাম। তার ওপর আবার স্কুলের তাড়াও লেগে থাকতো। আর, সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার, কাজের মাসীর কামাই! একে তো বৃষ্টিতে মায়ের কবিতাপ্রেম চাগাড় দিয়ে ওঠে, আর, এইসময় কোনওভাবে মা কে বিরক্ত করলে বেধে যেতো খন্ডযুদ্ধ। তবে, ভোরবেলা বিছানা ত্যাগের বিরহযন্ত্রণাটুকু বাদ দিলে বাকি দিনটা বেশ আনন্দেই কাটিয়ে দিতাম। বন্ধুদের সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চুড়মুড় খাওয়ার মজাটাই ছিলো আলাদা! এছাড়াও স্কুল ছুটি হলে স্কুলের মাঠে জব্বর ফুটবল খেলা হতো। আমার আকৃতির বিস্তার দেখে আমাকে গোলকিপারই রাখা হতো বারবার। আমার অবশ্য কোন অভিযোগ ছিলো না। আপাদমস্তক কাদা মেখে সন্ধ্যে নামার মুহূর্তে প্রাইভেট টিউটরের আসার কথা মনের মধ্যে উদয় হলে এক দুঃখভারাক্রান্ত মুখ নিয়ে বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করতাম। এলেই মায়ের বকুনি চোখ কান বন্ধ করে হজম করতে হত। এইভাবেই কাটতো বৃষ্টির দিনগুলো।
বর্ষাকাল আবার নাকি প্রেমের সময়। এমনটা শুনেছিলাম কোন একটা সিনেমা দেখে। আমি যদিও এইসব প্রেম-টেম থেকে একশো গজ দূরে থাকতাম। নার্শারিতে পড়াকালীন দু’-এক জন মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব পাতালেও পরে ক্রমে খানিকটা পরিপক্ক হলে ‘চাচা আপন প্রান বাঁচা’ পন্থা অবলম্বন করে মেয়েদের বেঞ্চ থেকে প্রায় কুড়িহাত দূরে বসতাম। তাই কোনওদিন প্রেম-টেমের ধারে কাছেও যাইনি। অবশ্য, আমার এক বন্ধু প্রেমে বেশ পটু ছিলো। হাইস্কুলে পড়াকালীন আমার খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে তাতে ‘i love you’ লিখে তার এক বান্ধবীর দিকে ছুঁড়ে দিতো। বলতো তাকে নাকি সে প্রানের চেয়েও বেশী ভালোবাসে। প্রবল ধন্দে ছিলাম। এই প্রানের চেয়ে বেশী ভালোবাসা জিনিসটা কিরকম?
যাক, এ তো গেল প্রেমের কথা! আরও একটি বিষয়, যা বৃষ্টি পড়লেই জাগ্রত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ।
‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে/ জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগেনা……’ গানটা শুনেছিলাম মায়ের গলায়। বইতেও পড়েছিলাম, নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আজ নাই রে/ ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাইরে….’।
সবকিছুই ভালো ছিলো, হিসেবগুলো মিলছিলো না। যে সব বঙ্গসন্তানরা অন্যান্য সময়ে অফিস থেকে বাড়ীতে ফিরে বিছানায় ল্যাদ খেয়ে পড়ে থাকতো তারাও বৃষ্টি এলেই রবীন্দ্রচর্চা শুরু করে দেয়। ভাবতাম, রবীন্দ্রনাথ কবি নাকি পদ্মার ইলিশ? বর্ষা ছাড়া জনসাধারনের কাছে পৌঁছোয় না! রেডিও স্টেশনগুলোতে সারাবছর বলিউডি ধুমধামমার্কা গান দিলেও এই বর্ষাকালে সন্ধেবেলা হঠাৎ রবীন্দ্রসংগীতের বাহার! আবার অনেকে, রবিঠাকুরের কাব্য কবিতা না পড়েই রেডিওতে গান শুনে চরম রবীন্দ্রপ্রীতি জেগে ওঠে, ‘আহা! কি সুন্দর ভাষা! সত্যি রবীন্দ্রনাথের জবাব নেই।’ বর্ষা চলে গেলেই আবার তাদের রোজকার ল্যাদ খাওয়া জীবনযাত্রায় বলিউডি ধুমধামমার্কা গান ফিরে আসে, রবীন্দ্রনাথ তোলা রাখা হল পরের বর্ষাকালের জন্য!
কেউ সত্যি বলেছেন, ‘বাঙালীর তুলনা হয় না!’
চিত্র প্রস্তুতি – নীলাঞ্জনা







