Photography

বর্ষাকাল ও রবীন্দ্রপ্রীতি

image

বাঙালীর বর্ষাকাল মানেই ছাদে বা রাস্তার মাঝখানে ধেই ধেই করে নৃত্য করা, সর্শে ইলিশ, খিচুড়ি আর নাকে তেল দিয়ে ঘুম। অবশ্য এই মরসুমে ছাত্রদের ও চাকুরীজীবীদের খুব চাপে থাকতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও এর শিকার। রাত্তিরবেলা বৃষ্টি হয়ে গলিটা নদীতে পরিণত হলেও ভোরবেলা প্রিয় বিছানা ছেড়ে কোচিং-এ যাওয়ার জন্য মা তাড়া লাগালে অসম্ভব অনীহা নিয়ে কোনওমতে উঠে ব্রাশ করে ঐ নদীর মধ্যে দিয়ে ফুলপ্যান্টকে জাঙিয়া করে নিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় লাগাতাম। তার ওপর আবার স্কুলের তাড়াও লেগে থাকতো। আর, সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার, কাজের মাসীর কামাই! একে তো বৃষ্টিতে মায়ের কবিতাপ্রেম চাগাড় দিয়ে ওঠে, আর, এইসময় কোনওভাবে মা কে বিরক্ত করলে বেধে যেতো খন্ডযুদ্ধ। তবে, ভোরবেলা বিছানা ত্যাগের বিরহযন্ত্রণাটুকু বাদ দিলে বাকি দিনটা বেশ আনন্দেই কাটিয়ে দিতাম। বন্ধুদের সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চুড়মুড় খাওয়ার মজাটাই ছিলো আলাদা! এছাড়াও স্কুল ছুটি হলে স্কুলের মাঠে জব্বর ফুটবল খেলা হতো। আমার আকৃতির বিস্তার দেখে আমাকে গোলকিপারই রাখা হতো বারবার। আমার অবশ্য কোন অভিযোগ ছিলো না। আপাদমস্তক কাদা মেখে সন্ধ্যে নামার মুহূর্তে প্রাইভেট টিউটরের আসার কথা মনের মধ্যে উদয় হলে এক দুঃখভারাক্রান্ত মুখ নিয়ে বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করতাম। এলেই মায়ের বকুনি চোখ কান বন্ধ করে হজম করতে হত। এইভাবেই কাটতো বৃষ্টির দিনগুলো।
বর্ষাকাল আবার নাকি প্রেমের সময়। এমনটা শুনেছিলাম কোন একটা সিনেমা দেখে। আমি যদিও এইসব প্রেম-টেম থেকে একশো গজ দূরে থাকতাম। নার্শারিতে পড়াকালীন দু’-এক জন মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব পাতালেও পরে ক্রমে খানিকটা পরিপক্ক হলে ‘চাচা আপন প্রান বাঁচা’ পন্থা অবলম্বন করে মেয়েদের বেঞ্চ থেকে প্রায় কুড়িহাত দূরে বসতাম। তাই কোনওদিন প্রেম-টেমের ধারে কাছেও যাইনি। অবশ্য, আমার এক বন্ধু প্রেমে বেশ পটু ছিলো। হাইস্কুলে পড়াকালীন আমার খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে তাতে ‘i love you’ লিখে তার এক বান্ধবীর দিকে ছুঁড়ে দিতো। বলতো তাকে নাকি সে প্রানের চেয়েও বেশী ভালোবাসে। প্রবল ধন্দে ছিলাম। এই প্রানের চেয়ে বেশী ভালোবাসা জিনিসটা কিরকম?
যাক, এ তো গেল প্রেমের কথা! আরও একটি বিষয়, যা বৃষ্টি পড়লেই জাগ্রত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ।
‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে/ জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগেনা……’ গানটা শুনেছিলাম মায়ের গলায়। বইতেও পড়েছিলাম, নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আজ নাই রে/ ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাইরে….’।

সবকিছুই ভালো ছিলো, হিসেবগুলো মিলছিলো না। যে সব বঙ্গসন্তানরা অন্যান্য সময়ে অফিস থেকে বাড়ীতে ফিরে বিছানায় ল্যাদ খেয়ে পড়ে থাকতো তারাও বৃষ্টি এলেই রবীন্দ্রচর্চা শুরু করে দেয়। ভাবতাম, রবীন্দ্রনাথ কবি নাকি পদ্মার ইলিশ? বর্ষা ছাড়া জনসাধারনের কাছে পৌঁছোয় না! রেডিও স্টেশনগুলোতে সারাবছর বলিউডি ধুমধামমার্কা গান দিলেও এই বর্ষাকালে সন্ধেবেলা হঠাৎ রবীন্দ্রসংগীতের বাহার! আবার অনেকে, রবিঠাকুরের কাব্য কবিতা না পড়েই রেডিওতে গান শুনে চরম রবীন্দ্রপ্রীতি জেগে ওঠে, ‘আহা! কি সুন্দর ভাষা! সত্যি রবীন্দ্রনাথের জবাব নেই।’ বর্ষা চলে গেলেই আবার তাদের রোজকার ল্যাদ খাওয়া জীবনযাত্রায় বলিউডি ধুমধামমার্কা গান ফিরে আসে, রবীন্দ্রনাথ তোলা রাখা হল পরের বর্ষাকালের জন্য!
কেউ সত্যি বলেছেন, ‘বাঙালীর তুলনা হয় না!’

চিত্র প্রস্তুতি – নীলাঞ্জনা

গ্রীষ্মকাল

DSCN1486

রৌদ্র প্রতাপ গ্রীষ্মকাল

দিকে দিকে শূণ্যতা,

শূণ্য মাঠ ফুটিফাটা

কালবোশেখির ব্যস্ততা।

স্তব্ধ দুপুরে চাতকের ডাক

মনে আনে ব্যাকুলতা,

পুষ্করিণীর শুষ্কতা

তরুলতার মলিনতা।

বয়ে যায় শীর্ণ স্রোতস্বিনী

ধীর-মন্দ গতি,

ধীরে চলে ক্লান্ত পথিক

তৃষ্ণা নিবারনে মতি।

মধু পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র

গোধূলির শেষে,

দগ্ধ দিনের অবসানে

জ্যোৎস্না ছড়ায় হেসে।

দখিনা বায়ু বয়ে চলে

মৃদুমন্দ গতি,

মেতে ওঠে অলিকুল

ব্যস্ততা অতি॥

(আমার মা- ‘শ্রীমতি লতা পাহাড়ী’-এর কলমে)

ওদের কথা

child
বড়ো রাস্তাটা পেরোলেই ওপাশে বাঁদিকে ঘুরলে রেলস্টেশনটা পড়ে। স্টেশনটার গঠন এখনও অসম্পূর্ণ। সেই কাজ সম্পূর্ণ করার জন্যই জন পঞ্চাশেক আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন স্টেশনের পেছনদিকের মাঠে তাঁবু খাঁটিয়ে বসবাস করছিলো। রোজ বিকেলবেলা স্টেশনে হাওয়া খেতে গিয়ে সেই সময় ওদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনেককিছু জেনেছিলাম।

আমাদের, অর্থাৎ তথাকথিত শিক্ষিত বঙ্গসন্তানদের থেকে ওরা আরও অনেকগুণ বেশী বুদ্ধি ধরে। এই ব্যাপারটা ওদের তাঁবু লাগানোর উপকরণ ও গঠনশৈলী থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। একদিন সন্ধেবেলা এমন ঝড় হয়েছিলো যে, পাশের বাড়ীর একটি অ্যাজবাসটেস এর ছাদ থেকে অ্যাজবাসটেস খুলে অনেক দূরে ছিটকে পড়েছিলো। পরের দিন সকালে স্টেশনে গিয়ে দেখেছিলাম ওদের প্রত্যেকটি তাঁবু সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় ছিলো। প্রথমবার দেখে যৎপরনাস্তি চমকিত হলেও ক্রমে ওদের অপার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেতে থাকি। আমাদের এই শিক্ষিত সমাজে সন্ধে নামলেই অফিসফেরত কর্তা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন, গিন্নি একচোখে টিভি সিরিয়াল দেখতে দেখতে অন্য চোখটি ও হাতগুলির সাহায্য নিয়ে রান্নার জোগাড়যন্ত্র করেন এবং তাদের ছোট্ট সন্তান গৃহশিক্ষকের ঠ্যলা খেতে খেতে জর্জরিত হয়ে গেলেও একরাশ কষ্ট বুকে চেপে ধরে চুপচাপ বসে থাকে। তাঁবুগুলোর কাছে পরিবেশটা সম্পূর্ণ আলাদা। ওদের বাচ্চা, বুড়ো, জোয়ান, স্ত্রী, পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সারাদিন গা ঝলসানো রোদের মধ্যে অনাবিল ঘাম ঝরিয়ে কাজ করে। সন্ধেবেলা সব্বাই একসাথে জড়ো হয়। এক জায়গায় জ্বলন্ত আগুনের চারপাশে গোলাকারে সবাই বসে ওদের ভাষায় গান ধরে। সেই সময় ওদের দেখলে কে বলবে যে, ওরা এতটাই হতদরিদ্র! মনে হয়, চার পাঁচতলা আকাশছোঁয়া ইমারতগুলোর মালিকদের থেকেও ওরা সহস্রগুণ ধনী। দুই ঘণ্টাখানেক একত্রে গানবাজনা করে রাত্তিরবেলা বনমোরগের মাংস খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
ওদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো স্টেশনের নলকূপ থেকে জল নিতে আসতো। দুই হাতে দুটো বড়ো বালতিতে জল ভর্তি করে কোমরে কাপড় দিয়ে জলের বোতল বেঁধে রোদের মধ্যে রওনা দিত তাঁবুগুলোর দিকে। একসাথে চার-পাঁচটি বাচ্চা আসতো জল নিতে এবং সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হল, ওরা যখন ফিরতো তখন এতো ভার বহন করা সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টা করতে করতে ফিরতো। একদিন একটি বাচ্চাকে ডেকে জিগ্যেস করেছিলাম, ‘তুই পড়বি?’ উত্তরে সে বলেছিলো, ‘হাসাস কেনি, বাবু?!’ ব্যাপারটা তখন হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলাম। ওদের কাছে স্কুল, লেখাপড়া এগুলো স্বপ্নাতীত। ওরা ওদের জীবনের চরম সত্যিটাকে মেনে নিয়েছে।

কয়েকটি বাচ্চা আবার বড়ো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা চাইতো। দামী সানগ্লাস পরিহিত অফিসমুখো বঙ্গসন্তানরা তাদের দেখলেই দশহাত দূর দিয়ে দ্রুতবেগে চলে যেত। স্কুল, কলেজমুখো কিশোররা তাদের দেখে ঠাট্টা তামাশা করতো আর, ভিক্ষা চাইলেই হাজাররকমের গালিগালাজের বন্দুক বের করে অনবরত গুলি ছুঁড়তে থাকতো। কিছু দয়াবান পুরুষ ও নারীরা তাদের প্রায় রোজই কিছু না কিছু সাহায্য করতো। আর কিছু মানুষের সাহায্য করার ইচ্ছে থাকলেও রাস্তার মধ্যে মাথা নোয়ানোর ভয়ে তারা সর্বদা ওদের না দেখার ভান করে এড়িয়ে যেত।

ওদের দেখে সত্যিই অবাক হতাম। আমরা রোজকার
হাজারো ছোটখাটো ঝামেলা নিয়ে লক্ষাধিক নাটক, অভিনয় করে বেড়াই। সহস্র মেকি চাহিদার তাড়না প্রতিমুহূর্তে মনের মধ্যে ছোটাছুটি করে। কিন্তু, ওরা শৈশব থেকেই ওদের শিরা-উপশিরার রক্তে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করার অঙ্গীকারকে মিশিয়ে দিয়েছে। তবুও ওরা কখনও কাঁদে না। যান্ত্রিক শহুরে জীবনযাত্রার সমূহ মেকি শুণ্যতা থেকে অনেক কোটি আলোকবর্ষ দূরে ওদের এক মজার দুনিয়া। সেখানে হাড়ভাঙা পরিশ্রম থাকলেও দিনের শেষে স্বর্গীয় শান্তি, পরিবারের ছত্রছায়া, মায়ের স্নেহমাখা আঁচলের স্পর্শ রয়েছে। প্রকৃতি মায়ের স্নেহের দান দুহাত ভরে নিয়ে ওরা বড়ো হচ্ছে তিলে তিলে। আর, তথাকথিত অসভ্য জাতি ওরা, সভ্যজগতের জন্য গড়ে দিয়ে চলেছে সভ্যতা, সেই আদিমযুগ থেকে আদিঅনন্তকাল পর্যন্ত…..

(ছবি সৌজন্যে- নিজস্ব ক্যামেরা)

সূয্যিমামা

sunrise

ভোরবেলার সূর্যকে নিয়ে অনেক রকমের প্রবাদ আছে। আগেকার দিনের দাদু, দিদিমাদের বলতে শুনেছি, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সবার আগে সূর্যকে পেন্নাম করতে হয়।
তো যখন ছোট ছিলাম, ঘুম-টুম খুব একটা হতোনা রাত্রিবেলা। চারিদিকে শুধু লাফালাফি করতাম, খাতায় পেন্সিল দিয়ে হাবিজাবি অ্যাবস্ট্রাক্ট পেন্টিং করতাম আর, ঘুমোনোর নাম করে বিছনায় শুধু শুধু পড়ে থাকতাম এবং বাবা ঘুমোতে এলে কিছুতেই ঘুমোতে দিতাম না। সে যাই হোক, ঠাকুমার কথা শুনে রোজ কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে সূয্যিমামার দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে কিছু যেন বিড়বিড় করতাম। কি বিড়বিড় করতাম সেটা মনে নেই। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেছি শুনে মা প্রথমে খুব আনন্দিত হলেও পরক্ষণে টের পান যে, ভোরবেলা মোটেও পড়াশোনা করার জন্য বিছানা ছাড়িনি।
শুনেছি পুরাণে ও গীতাতেও নাকি সূর্যদেবতার অপার মহিমার কথা যথাযথভাবে উল্লিখিত আছে। ভোরে অবশ্য তাঁর দাপট খানিকটা কম হয়। আর গ্রীষ্মকাল হলে তো কোন কথাই নেই, তার চাপে সবাই অতিষ্ঠ। একটি বাচ্চা ছেলে আমায় একবার প্রশ্ণগুলো করেছিলো, আমরা তো সূর্য ও চাঁদকে একই রকম দেখি, তো, নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে পৌঁছে ওখান থেকে লাফিয়ে সূর্যে যেতে পারলেন না কেন? সূর্যে কি এলিয়েন থাকে? সূর্যের এলিয়েনগুলোর শরীর কি আগুন দিয়ে তৈরী? ইত্যাদি….ইত্যাদি…..
প্রশ্ণগুলো নেহাত ভাট বকার মতো শোনালেও মস্তিষ্কে মুষ্টাঘাত প্রয়োগ করেছিল। সত্যিই তো, একটা একরত্তি বাচ্চার চিন্তাশক্তি কদ্দূর চলে গেছে!
সকলেই তো রোজ সূর্যকে দেখি। গ্রীষ্মকালে প্রাণভরে গালাগাল দেই, অথচ কখনো এতো তলিয়ে ভাবাই হয়নি। হয়তো ওখানে মানুষ, জীবজন্তু, পোকামাকড়, গাছগাছালি ছিল, আকস্মিক প্রকান্ড দাবানলে সব জ্বলে গেছে, দীপ্ত লেলিহান শিখা এখনও থেকে গেছে। তিলে তিলে প্রতিমুহূর্তে জ্বলছে সে….অনন্তকাল….

ছবি সৌজন্যে- নিজস্ব ক্যামেরা