Bangla Stories

চা’ওয়ালা

02

মৃদু-মৃদু হাওয়া দিচ্ছে, সদ্য সিঙাড়ার গন্ধ, চায়ের গ্লাসের টুংটাং। বাপিদা’র দোকানের এই এক যাকে বলে ‘খাস বাত’। কাস্টোমার কখনও বোর হবে না। সারাক্ষন বাপিদা জ্ঞান ঝেড়েই চলেছে। কখনও বৌকে খুশি রাখার পদ্ধতি, কখনও দীপিকার বেশভূষা, কখনও বিরাটের কভার ড্রাইভ, আবার কখনও দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে হাজারো টিপ্পনি, সব পাবেন বাপিদা’র থেকে। মানুষটি নিপাট ভদ্র। এত ভদ্র যে, এক লিটার দুধ দিয়ে একশোজন মানুষকে চা খাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু চা নিয়ে কেউ কখনও অভিযোগ জানায়নি, রেকর্ড আছে।
আমার তো বেশ লাগে জায়গাটা। কেমন একটা লোকসভা- লোকসভা গোছের। প্রসূনদা বৌদির রান্না নিয়ে আলোচনা করছে, রবিনকাকা কোরাপশান নিয়ে বিদ্রোহী বাতেলা দিচ্ছে, বাপিদা স্পিকারের মতো সবকিছু সামাল দিচ্ছে, আর আমি বেচারা মনমোহন সিংয়ের মতো একসাইডে চুপচাপ বসে আছি। চারিদিক থেকে জ্ঞানের তীর এসে বিঁধছে। এমন তীরে আহত হতে ক‍ার না ভালো লাগে বলুন!
শুধু সমস্যা হয় বিলু এলে। বিলু আমাদের পাড়ায় থাকে। ভালো নাম কি যেন একটা, ইয়ে, আমারও মনে থাকে না। বিলুর বাবা এই চত্বরের একমাত্র ডাক্তার। ব্লাডপ্রেশার চেক থেকে অস্ত্রোপচার সব একাই পারেন। খাঁটি ট্যালেন্টেড মানুষ। বিলু এখন ইউনিভার্সিটি পাস আউট। সারাদিন উড়ে উড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যেবেলা বাপিদা’র দোকানে আসে মাঝে সাঝে। এসেই দুম্ করে এমন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে বসবে, যার উত্তর দেওয়ার সাধ্যি বাপিদা’র চৌদ্দ্য পুরুষের নেই। আর, আমার তো নেই ই।

সেদিন পূর্ণিমার সন্ধ্যেবেলা বিলু লেবু চায়ে টান দিয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করলো,’আচ্ছা, এই যে তোরা চা খাস, ত‍াতে আবহাওয়া কতোটা ড্যামেজ হয় জানিস?’

আকস্মিক কসমিক সওয়াল! এর উত্তর জুত করে দিয়ে ফেলবো, নাহ্, এতোটা বুদ্ধিমান বা পাগল আমি নই।

প্রসূনদা একবার ড্যাব-ড্যাব করে বিলুর দিকে চেয়ে চশমাটা খুলে বললো,’চা, আর আবহাওয়া? মানে, পুরো চালতা আর সিমেন্টের মতো ব্যাপার। টকিং অ্যাবাউট চা, সে তো তুইও হুস-হুস শব্দ করে খাস, আর যদ্দূর আবহাওয়‍া সম্পর্কে জানি, তার পেছনে কাঠি করার জন্যে তো অন্য ঘটনা রয়েছে, ঐ যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং’।

05

-‘উঁ হুঁঃ, এখানেই তো হোঁচট খেলে তুমি। কসমোলজি বলছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্ষান্ত হয়েছে। কুমেরুর বরফ গলবে না, তুমি ভাসবে না।’

-‘ভাসবো না! ইয়ে, মানে, তবে যে খবরে, বইতে লেখা ছিলো!’

-‘স্রেফ ভাঁওতা। কখনও ভেবে দেখেছো, এই যে তুমি সারাদিনে তিরিশ খানা সিগারেট টেনে ধোঁয়া ওড়াও, সেটা কতো ক্ষতি করছে!’

-‘ঐ টুকুতে কিছু হয় নাকি?’

-‘এক্সাক্টলি। তেমনি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে পৃথিবী যে হারে গরম হচ্ছে, তাতে তুমি কেন, তোমার আগামী কুড়ি প্রজন্মও হেসে-খেলে টিকে যাবে।’

-‘তা হোক্। কিন্তু বললি না এখনও চ‍‍া কিভাবে দূষণ করছে?’

-‘ও তুমি বুঝবে না।’

-‘কি যে সব বলে!’

বাপিদা দোকানের ভেতর থেকে বলে উঠলো,’নাহ্! তোরা আর কেউ বড়ো হলি না। উল্টোপাল্টা কথাবার্তা সারাক্ষণ! ওদিকে দেখ্ আমার মতো চাওয়ালা প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলো! আমারও এবার একটা চেষ্টা করার দরকার অাছে। আর ভাল্লাগে না একদম এসব।’

বিলু ফিচ্ করে হেসে বললো,আগে লুঙ্গি সামলাতে শেখো, তারপর দেশ সামলাবে। কালই মিত্র বৌদির সামনে খুলে যাচ্ছিলো। অঘটন হতে বেশী সময় লাগে না। সাবধান হও।’

-‘পেছনে না লেগে এবার বিদেয় হ না বাপু। একটা সরকারি চাকরি জুটিয়ে বিয়ে-থা করে হিল্লে কর্। আর কদ্দিন শুধু আমাদের জ্ঞান দিবি?’

-‘সরকারি চাকরি? কে দেবে?’

04

-‘শুনলাম প্রাইমারির তো দশ লাখ রেট চলছে। কেন্দ্রের চাকরিও আছে। তোর কি টাকার অভাব? বাবাকে বল্ ডিসপেনসারিটা বেচে দিতে। পাক্কা একখানা চাকরি জুটে যাবে।’

-‘রক্ষে করো বাপিদা, ঐ যৌতুক আমার চাই না।’

-‘কেন? সমস্যা কী? আরে পুরো লাইফ সেট হয়ে যাবে। তারপর আনন্দ কর জীবনভর।’

-‘হ্যাঁ। এই আনন্দ লোকে নিতে যাচ্ছে বলেই তো চাকরির নিলাম হচ্ছে। সবাই দর লাগাচ্ছে। যার দর হাঁক বেশী, তার চাকরি।’

-মন্দ কী? এতো বছর তোকে খাওয়াবে, পরাবে, তোর ভরণপোষণ করবে, আর তুই তার আগে একটু খসাতে পারবি না!’

-‘না। পারবো না। এটাই তো সমস্যা। তুমি সুখ ভালোবাসো, নীতি নয়, স্রোত ভালোবাসো, সত্য নয়। তাই তুমি হাসিমুখে লাইনে দাঁড়িয়েছিলে ছ’মাস। বলতে পারো, তোমার টাকা তুমি নেবে তাতে চারঘন্টা লাইন কেন দিতে হবে তোমায়? চোর তো তুমি নও, আহম্মকও নও।’

-‘সে একটু মানিয়ে নিতে হয়, সবার ভালোর জন্যে।’

-‘তারপর? কি হলো? তোমার চারশো ঘন্টার ঘাম ঝরানো কালোটাকাওয়ালাদের চর্বি ঝরাতে পারলো কিনা জেনেছো?’

-‘নিশ্চয়ই হয়েছে। সবাই তো আর বোকা নয়!’

মুচকি হেসে বিলু বললো,’তোমারই বন্ধু তো ওমর। তাকে এপাড়ায় কেনো থাকতে দেওয়া হয়নি সেটা তুমি জানো না?
বাপিদা, উপেক্ষাটা কিন্তু সমাধান নয়। কিছুক্ষন আগেই বলছিল‍াম, চা দূষিত করছে আবহাওয়াকে, একটা চাওয়ালা করছে পুরো দেশটাকে।’

………..

বেশ অনেকদিন আর দেখা হয়নি বিলুর সাথে। শেষবার দেখা হয়েছিলো পুজোর পরে পরে। তখন জগতশুদ্ধু সামগ্রীর সাথে আধার লিঙ্ক করাচ্ছি। সেদিনও আমায় অনেক বাতেলা ঝেড়েছিলো। কিছু মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছিলো,তবু মনে আছে।
এখন আর বিলুকে দেখা যায় ন‍া এ পাড়‍ায়।
শুনেছি এখন নিজে ব্যবসা করে। শেষ অবধি হার মানলো না ছেলেটা।।

 

 

Photo Courtesy- raghukamath.com

26/11

– এতক্ষণ কি খুচখুচ করছিস মোবাইলে?

– ঝিঙ্কু একখানা স্টেটাস দেবো ফেবুতে, ভাবছি কি দেবো। 

– কেন? আজ কোনো প্রেমের গপ্পো পড়লি নাকি?

– আরে না..না..কি যে বলো…

– তবে?

– আজ অ্যানিভার্সারি না?!

– কিসের?

– ঐ যে, মুম্বই অ্যাটাকের!

– ও…হ্যাঁ..আজ তো ওটাই ট্রেন্ডিং! তা কিছু বেস্ ঠিক করলি? 

– মানে?

– মানে, পাকিস্তানকে খিস্তি দিবি নাকি ইসলামকে?

– ইয়ে…ওই ব্যাপারেই একটু ঘেঁটে আছি।

– কেন? তখন তো গলা ফাটিয়ে আইডিওলজিস্টদের সাথে গলা মেলাচ্ছিলি..”ইসলাম মুর্দাবাদ”! আজ নেতিয়ে পড়লি?!

– নেতিয়ে পড়িনি…ওই একটু ইতস্ততঃ বোধ করছি। ধর্মের ব্যাপার তো!

– আচ্ছা?! তাই না?! ইসলামে কি এই খুনগুলোর সুপারি দেওয়া ছিলো? কি মনে হয় তোর?!

– না..মানে..ওরা আর কি পারে বলো?! আমাদের পুরো নগ্ন করে দিলো!

– আচ্ছা..তুই তাহলে ঐ আবরনের কাপড় খুঁজছিস?

– আমি যুদ্ধ চাইছি! কোরানকে তার যোগ্য জবাব দেব!

– কার্গিল পার্ট টু?! তা এই যুদ্ধের লক্ষ্য কি হবে? কোরানের মৃত্যু ?

– হুম..আমরাই শ্রেষ্ঠ!

– ও..তা বটে…তুই তো রীতিমতো ঐ সেলিব্রিটিদের মতো দাবি করছিস!

– কোন সেলিব্রিটি?

– ঐ যে, যারা আমাদের নয়, মনুষ্যত্বকে নগ্ন করেছিলো, ইসলামকে ছিঁড়ে ফেলেছিলো…ঐ বোটে আসা মানুষখেকো বর্বরগুলো…যারা ধর্মের এক শতাংশ বুঝলেও আল্লাহ্ বলতেন “মোগ্যাম্বো খুশ হুয়া”!

(চিত্র সংগৃহিত)

নোটব্যান


– নোটব্যান সাপোর্ট করছেন তাহলে?
– বিলক্ষণ! এই না হলে দেশ! কোরাপশন ফ্রি, ব্ল্যাকমানি ফ্রি, দুর্দশা ফ্রি, পুরো স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন চিন্তাভাবনা। আবার আজকাল তো ইন্টারনেটও ফ্রি! সত্যি মশাই, অনেকটা আমেরিকাকে টক্কর দিচ্ছি আমরা।

– ওবামা সমর্থন করছেন তাহলে?

– ওবামা কি মশাই! ওবামার বাবা-মা সকলে সমর্থন করছেন। আমাদের প্রেসিডেন্টের সাথে কোলাকুলির সিনটা দেখেননি?!

– কিন্তু সে তো নোটব্যানের অনেক আগে!

– আহ্! মোদ্দা কথা হল তিনি আমাদের দেশের পাশে আছেন। আরে তিনি তো বটেই, ট্রাম্পসাহেব ও আমাদের পাশে আছেন। আমাদের চারিদিক থেকে বেষ্টন করে আছেন। ‘ক্যুইটার’ দেখেন না?! ওখানেও অনেকে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন।

– না…আসলে ওইসব এই বয়সে আর..মানে…

– এই হলো মশাই আপনাদের বদরোগ! দেশের তাবড় তাবড় শিল্পপতিরা বিনি পয়সায় ইন্টারনেট দিচ্ছে, দেশ চেঁচাচ্ছে ‘ডিজিট্যাল হও..ডিজিট্যাল হও’, আর আপনারা এখনও বোকাবাক্স আর খবরের কাগজের বাইরে বের হতে পারলেন না! আরে…আমরা সেই দেশ, যারা কিছুদিন আগে মঙ্গলে পৌছোলাম!

– তা বটে, তা বটে! বেড়ে কাজ করছে মশাই আমাদের দেশ! কিন্তু বলতে পারেন, ঐ ফুটপাথের হাড়গিলে কঙ্কালগুলোর কি হবে? ওগুলো কি কোনোদিন চামড়া-মাংস পাবে না?!

– আরে মশাই…ওটা টাইমের ব্যাপার। ওগুলো নন্ প্রফিটেবল ইনভেস্টমেন্ট, বুঝলেন কিনা! ইকনমিক্স বোঝেন তো? ওগুলো সুরাহা করতে কেউ পা বাড়াবে না। এই রোবোটের যুগে থাক কিছু জ্যান্ত রোবোট!

– হুম..প্রোভার্টি ইজ আওয়ার ক্লোথ অ্যান্ড হাঙ্গার ইজ আওয়ার ফ্যাশন!

– কারেক্ট…নো সন্দেহ।

– এই যে…আমার বাস আসছে। আরে..বাই দ্য ওয়ে…অাপনি কি করেন?

– আমি টিউশনি পড়াই..প্রাইভেট টিউটর। আর আপনি?

– আজকাল ব্যাঙ্ক আর এটিএমের বাইরের লাশগুলো গুনছি…

চললাম…

(চিত্র ইন্টারনেট হইতে সংগৃহীত)

মধুরে-ন সমাপয়েৎ

thrill

– এত উদাসীন কেন? কি হয়েছে?

– মধ্যরাত্রি বিপর্যয়, অর্থাৎ, মিডনাইট ক্রাইসিস।

– উফ্, এই মাঝরাত্তিরে কি এমন বিপত্তি ঘটলো?

– শুধু বিপত্তি নয়, ম্যাক্রো সাইজের দ্বিধাও বলতে পারো।

– স্টপ হেঁয়ালি, প্লিজ! বলো না কি হয়েছে?

– যুদ্ধ!

– অ্যাঁ! চাঁদ এখন ফ্যালফ্যাল করে উঁকি মারছে, স্টেশন ফাঁকা, মোড়ের কুকুরগুলোর ভ্যানতাড়াও বন্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। পিন ড্রপ সাইলেন্ট নাইট! এখন তুমি কোন্ সিপাহী বিদ্রোহের পটভূমির কথা বলছো?

– সিপাহী বিদ্রোহ নয়, তবে মস্তিস্ক বিদ্রোহ বলতে পারো।

– অর্থাৎ?

– অর্থাৎ, ফ্রিজ খুলে দেখলাম আইসক্রিম রয়েছে আবার জলভরাও রয়েছে। বোথ আর ফ্রেশ এনাফ্। তাই কোনওভাবেই ডিসাইড্ করতে পারছি না কোনটা খাওয়া সমীচিন।

– মাঝরাত্তিরে জলভরা, আইসক্রিম? শরীর ঠিক আছে তো?

– অ্যাবসল্যুটলি ফাইন্। মাঝরাত্রে ঘুম ভেঙে উঠে আইসক্রিম খাওয়ার থ্রিলটা গ্র্যাব করতে চাইছিলাম। যুদ্ধটা বাধালো জলভরা।

– রিয়লি, ইউ নিড সাইকিয়াট্রিস্ট হেল্প। ফ্রিজ খুলে দেখো, না আইসক্রিম আছে, না জলভরা।

– হোয়াট!

– হুঁ! কাল সমু আইসক্রিমের পুরোটাই চেটে পুটে খেয়ে নিয়েছে। আর জলভরা, সে তো প্রায় মাসখানেক আনাই হয়নি!

– হলি ক্র্যাপ! এ কি তবে নিছক হ্যালুসিনেশন্? নাকি ইনোসেন্ট স্বপ্ন?

– ইনোসেন্ট? স্কুল পালানো বিচ্ছুরাও অমন এঁদোমার্কা স্বপ্ন দেখে না।

– স্বপ্নের আবার ক্লাস হয় নাকি?

– হয় বৈ কি!

– আর, স্বপ্নে হ্যালুসিনেশন্? সেটা পসিবল্?

– উঁ হুঁ! তা জানা নেই। তবে মাইন্ড পজিটিভ থাকলে স্বচ্ছন্দে সাফসুতরো স্বপ্ন দেখা যায়। আর, দিনরাত খাই-খাই করলে স্বপ্নেও আইসক্রিম, জলভরা, চকোলেট এইসমস্ত বস্তু দেখা দেবেন।

– ও, থ্যাঙ্কস্ আ লট্। চকোলেটের কথা তো মনেই ছিলো না। কালই এনেছিলাম। ফ্রিজে এখনও স্বমহিমায় উপবেশিত থাকা উচিত। আইসক্রিম, জলভরা না থাক্, চকোলেট ইজ্ টেস্টি এনাফ্ ফর্ মিডনাইট থ্রিল্।

– ওয়ান বাইট্ ফর মি টু!

– তুমিও?

– তোমার ‘হাফ্’ বলে কথা!