Bengali Blog

চা’ওয়ালা

02

মৃদু-মৃদু হাওয়া দিচ্ছে, সদ্য সিঙাড়ার গন্ধ, চায়ের গ্লাসের টুংটাং। বাপিদা’র দোকানের এই এক যাকে বলে ‘খাস বাত’। কাস্টোমার কখনও বোর হবে না। সারাক্ষন বাপিদা জ্ঞান ঝেড়েই চলেছে। কখনও বৌকে খুশি রাখার পদ্ধতি, কখনও দীপিকার বেশভূষা, কখনও বিরাটের কভার ড্রাইভ, আবার কখনও দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রত্নতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে হাজারো টিপ্পনি, সব পাবেন বাপিদা’র থেকে। মানুষটি নিপাট ভদ্র। এত ভদ্র যে, এক লিটার দুধ দিয়ে একশোজন মানুষকে চা খাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু চা নিয়ে কেউ কখনও অভিযোগ জানায়নি, রেকর্ড আছে।
আমার তো বেশ লাগে জায়গাটা। কেমন একটা লোকসভা- লোকসভা গোছের। প্রসূনদা বৌদির রান্না নিয়ে আলোচনা করছে, রবিনকাকা কোরাপশান নিয়ে বিদ্রোহী বাতেলা দিচ্ছে, বাপিদা স্পিকারের মতো সবকিছু সামাল দিচ্ছে, আর আমি বেচারা মনমোহন সিংয়ের মতো একসাইডে চুপচাপ বসে আছি। চারিদিক থেকে জ্ঞানের তীর এসে বিঁধছে। এমন তীরে আহত হতে ক‍ার না ভালো লাগে বলুন!
শুধু সমস্যা হয় বিলু এলে। বিলু আমাদের পাড়ায় থাকে। ভালো নাম কি যেন একটা, ইয়ে, আমারও মনে থাকে না। বিলুর বাবা এই চত্বরের একমাত্র ডাক্তার। ব্লাডপ্রেশার চেক থেকে অস্ত্রোপচার সব একাই পারেন। খাঁটি ট্যালেন্টেড মানুষ। বিলু এখন ইউনিভার্সিটি পাস আউট। সারাদিন উড়ে উড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যেবেলা বাপিদা’র দোকানে আসে মাঝে সাঝে। এসেই দুম্ করে এমন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে বসবে, যার উত্তর দেওয়ার সাধ্যি বাপিদা’র চৌদ্দ্য পুরুষের নেই। আর, আমার তো নেই ই।

সেদিন পূর্ণিমার সন্ধ্যেবেলা বিলু লেবু চায়ে টান দিয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করলো,’আচ্ছা, এই যে তোরা চা খাস, ত‍াতে আবহাওয়া কতোটা ড্যামেজ হয় জানিস?’

আকস্মিক কসমিক সওয়াল! এর উত্তর জুত করে দিয়ে ফেলবো, নাহ্, এতোটা বুদ্ধিমান বা পাগল আমি নই।

প্রসূনদা একবার ড্যাব-ড্যাব করে বিলুর দিকে চেয়ে চশমাটা খুলে বললো,’চা, আর আবহাওয়া? মানে, পুরো চালতা আর সিমেন্টের মতো ব্যাপার। টকিং অ্যাবাউট চা, সে তো তুইও হুস-হুস শব্দ করে খাস, আর যদ্দূর আবহাওয়‍া সম্পর্কে জানি, তার পেছনে কাঠি করার জন্যে তো অন্য ঘটনা রয়েছে, ঐ যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং’।

05

-‘উঁ হুঁঃ, এখানেই তো হোঁচট খেলে তুমি। কসমোলজি বলছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্ষান্ত হয়েছে। কুমেরুর বরফ গলবে না, তুমি ভাসবে না।’

-‘ভাসবো না! ইয়ে, মানে, তবে যে খবরে, বইতে লেখা ছিলো!’

-‘স্রেফ ভাঁওতা। কখনও ভেবে দেখেছো, এই যে তুমি সারাদিনে তিরিশ খানা সিগারেট টেনে ধোঁয়া ওড়াও, সেটা কতো ক্ষতি করছে!’

-‘ঐ টুকুতে কিছু হয় নাকি?’

-‘এক্সাক্টলি। তেমনি গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে পৃথিবী যে হারে গরম হচ্ছে, তাতে তুমি কেন, তোমার আগামী কুড়ি প্রজন্মও হেসে-খেলে টিকে যাবে।’

-‘তা হোক্। কিন্তু বললি না এখনও চ‍‍া কিভাবে দূষণ করছে?’

-‘ও তুমি বুঝবে না।’

-‘কি যে সব বলে!’

বাপিদা দোকানের ভেতর থেকে বলে উঠলো,’নাহ্! তোরা আর কেউ বড়ো হলি না। উল্টোপাল্টা কথাবার্তা সারাক্ষণ! ওদিকে দেখ্ আমার মতো চাওয়ালা প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলো! আমারও এবার একটা চেষ্টা করার দরকার অাছে। আর ভাল্লাগে না একদম এসব।’

বিলু ফিচ্ করে হেসে বললো,আগে লুঙ্গি সামলাতে শেখো, তারপর দেশ সামলাবে। কালই মিত্র বৌদির সামনে খুলে যাচ্ছিলো। অঘটন হতে বেশী সময় লাগে না। সাবধান হও।’

-‘পেছনে না লেগে এবার বিদেয় হ না বাপু। একটা সরকারি চাকরি জুটিয়ে বিয়ে-থা করে হিল্লে কর্। আর কদ্দিন শুধু আমাদের জ্ঞান দিবি?’

-‘সরকারি চাকরি? কে দেবে?’

04

-‘শুনলাম প্রাইমারির তো দশ লাখ রেট চলছে। কেন্দ্রের চাকরিও আছে। তোর কি টাকার অভাব? বাবাকে বল্ ডিসপেনসারিটা বেচে দিতে। পাক্কা একখানা চাকরি জুটে যাবে।’

-‘রক্ষে করো বাপিদা, ঐ যৌতুক আমার চাই না।’

-‘কেন? সমস্যা কী? আরে পুরো লাইফ সেট হয়ে যাবে। তারপর আনন্দ কর জীবনভর।’

-‘হ্যাঁ। এই আনন্দ লোকে নিতে যাচ্ছে বলেই তো চাকরির নিলাম হচ্ছে। সবাই দর লাগাচ্ছে। যার দর হাঁক বেশী, তার চাকরি।’

-মন্দ কী? এতো বছর তোকে খাওয়াবে, পরাবে, তোর ভরণপোষণ করবে, আর তুই তার আগে একটু খসাতে পারবি না!’

-‘না। পারবো না। এটাই তো সমস্যা। তুমি সুখ ভালোবাসো, নীতি নয়, স্রোত ভালোবাসো, সত্য নয়। তাই তুমি হাসিমুখে লাইনে দাঁড়িয়েছিলে ছ’মাস। বলতে পারো, তোমার টাকা তুমি নেবে তাতে চারঘন্টা লাইন কেন দিতে হবে তোমায়? চোর তো তুমি নও, আহম্মকও নও।’

-‘সে একটু মানিয়ে নিতে হয়, সবার ভালোর জন্যে।’

-‘তারপর? কি হলো? তোমার চারশো ঘন্টার ঘাম ঝরানো কালোটাকাওয়ালাদের চর্বি ঝরাতে পারলো কিনা জেনেছো?’

-‘নিশ্চয়ই হয়েছে। সবাই তো আর বোকা নয়!’

মুচকি হেসে বিলু বললো,’তোমারই বন্ধু তো ওমর। তাকে এপাড়ায় কেনো থাকতে দেওয়া হয়নি সেটা তুমি জানো না?
বাপিদা, উপেক্ষাটা কিন্তু সমাধান নয়। কিছুক্ষন আগেই বলছিল‍াম, চা দূষিত করছে আবহাওয়াকে, একটা চাওয়ালা করছে পুরো দেশটাকে।’

………..

বেশ অনেকদিন আর দেখা হয়নি বিলুর সাথে। শেষবার দেখা হয়েছিলো পুজোর পরে পরে। তখন জগতশুদ্ধু সামগ্রীর সাথে আধার লিঙ্ক করাচ্ছি। সেদিনও আমায় অনেক বাতেলা ঝেড়েছিলো। কিছু মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছিলো,তবু মনে আছে।
এখন আর বিলুকে দেখা যায় ন‍া এ পাড়‍ায়।
শুনেছি এখন নিজে ব্যবসা করে। শেষ অবধি হার মানলো না ছেলেটা।।

 

 

Photo Courtesy- raghukamath.com

ইন্টারভিউ (ভেতর দেখা)

এই ব্রম্ভান্ডের প্রতিটা প্রাণী কখনো না কখনো ইন্টারভিউ এর খপ্পরে পড়েছে। সংসারে আমাদের সবাইকেই হরবখত এই কাজটা করতে হয়। আমাদের ধারণা যিনি ইন্টারভিউ নেন তিনি সুপন্ডিত এবং অদৃশ্য এক হাঁড়ি প্রার্থীর মাথায় ভাঙার জন্য সদা প্রস্তুত। কুটিল কৌশলে তিনি বেমালুম,  প্রার্থীর কোষ্ঠী বিচার করেন।সুপ্রীম পাওয়ার থেকে জিরো আওয়ার সব তিনিই।
                    এ হেন কৌশলের মুখে ছাই দেওয়ার হরেক প্রচেষ্টা অনেকের সাথে আমিও করেছি। কিভাবে কর্তাদের পাল্টা চাপে ফেলে তার চক্রব্যুহ কেটে বেরিয়ে আসা যায় সেটা আয়ত্ত করাই মুখ্য। প্রথম ইন্টারভিউ তে গিয়েছিলাম একটা লিফট্ কোম্পানীতে, দলিল দস্তাবেজ নিয়ে প্রকান্ড হলঘরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ,বেরিয়ে আসা কয়েকজনের থেকে জানতে পারলাম গাড়ীর বৈদ্যুতিক নকশা নিয়েই বেশী প্রশ্ন হচ্ছে, এবং যে প্রার্থী যে গাড়ীতে চড়েছে তার প্রশ্ন সেই গাড়ী চেপেই আসছে। সুতরাং..
ঠিক করলাম আমাকে বাঁচাতে পারে একমাত্ৰ গরুর গাড়ী।

                      -আচ্ছা, অনিমেষ গুড মর্নিং। আপনি কোন কোন গাড়ী চড়েছেন?
সপ্রতিভ হয়ে বললাম , আমি গরুর গাড়ী ছাড়া কিছুতেই চাপিনি। 
খানিক টা আব গিলে তিনি বললেন, কলকাতায় এলেন কিভাবে? 
-কেনো হেঁটে হেঁটে ….
 এবার তিনি বললেন, আচ্ছা আপনি ট্রেন দেখেছেন?

 বললাম হু দেখেছি “পথের পাঁচালী” সিনেমাতে , কাশ বন দিয়ে দৌড়াচ্ছে ….
উনি বললেন , টিভিতে দেখেছেন?  
বললাম, না টিভিতে নয় খবরের কাগজের ছবিতে। 

(মনে মনে ভাবছি একে ইলেকট্রিক এর কিছু দেখেছি বললেই আমার সাড়ে সতেরো অবস্থা হবে)
 উনি এবার বললেন , আচ্ছা  এই টিউবলাইট টা সুইচ অন করলে কিভাবে কাজ করছে ?  
আমি বললাম , ইলেকট্রিক সার্কিট সম্পূৰ্ণ হয়েছে তাই।

এটা শুনে আমার মাথায় হাঁড়ি ভাঙ্গার উচ্ছাসে বলেই ফেললেন ….আচ্ছা ইলেকট্রিক কি ?

( ডুবে যাবার আগে ,বাঁচার অন্তিম চেষ্টা ….মনস্থির করলাম , এ চাকরী আমার জুটবেনা। সপ্তবর্ষব্যাপী চলা এই যুদ্ধের ইতি টানবো এবার )

আমি বলেছিলাম , পৃথিবীতে এখন সবকিছু নকল . তবুও খাঁটি জিনিষ পাওয়া যায় , সেই খাঁটি জিনিষটাই এই ইলেকট্রিক।
 মুচকি হেসে বলেছিলেন , খাঁটি যে কি করে বুঝবো ?
মুখের হাসি চওড়া করে বলেছিলাম , হাতে নিয়ে পরখ করে দেখুন। 

তবেই খাঁটি ইলেকট্রিক বুঝতে পারবেন।
শেষে এটাই বলেছিলেন , কোন কলেজ থেকে পাশ আউট ??

পুনর্মিলন

বাইরে আইসক্রিমওয়ালার ‘টিং-টিং’ শব্দে এক লহমায় ঘোর কাটলো ভুজঙ্গবাবুর। বেশ আয়েস করে ইজিচেয়ারে নিজেকে বিস্তৃত করে নিজের পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির কথা ভাবছিলেন, হতচ্ছাড়াটা সব মাটি করে দিলো। ভুজঙ্গবাবুর পরিবার বলতে তিনি এবং তিনি নিজেই। এই একান্ন বছর বয়সেও তিনি গর্বিত ব্যাচেলার। তিনকুলে তাঁর কেউ নেই, যাঁরা আত্মীয় পরিজন রয়েছেন, কেউ তাঁর ধারেকাছে ঘেঁষেন না। লোকটি মারাত্মক বদরাগী এবং ততোধিক কৃপণ। এক্সট্রা খরচার ভয়ে তিনি বিয়েই করেননি। এমনকি প্র্যাক্টিক্যালের খরচা আলাদা দিতে হবে শুনে কলেজে ভর্তির সময়ে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ছেড়ে অঙ্কেই নিজেকে টেনে ঢুকিয়েছিলেন। তাঁর বাড়ীতে কোনও কাকপক্ষীও আসে না। মোদ্দা কথা হলো, তিনি নিজে ব্যতিত জগৎসংসারের আপামর প্রানীকুল তাঁর উদার মনোভাবের বিষয়ে অবগত ছিলো। পাড়ায় পুজো-টুজো হলে তাঁর কাছে কস্মিনকালে চাঁদা চাইতে কেউ আসতো না। তাতে অবশ্যি তাঁর কোনওরকমের অভিযোগ ছিলো না, উপরন্তু খুশি হতেন। সাতে-পাঁচে নিজেকে না জড়িয়ে কুপমন্ডুক ধনী হওয়ায় অনেক বেশী সুখ। 

এহেন ভুজঙ্গবাবু আইসক্রিমওয়ালার ঘন্টার শব্দে তেড়েফুঁড়ে উঠে বসে অপার খিস্তাচ্ছেন, এমন সময়ে দরজায় ‘খট্-খট্’ আওয়াজ। এক নিঃশ্বাসে একগেলাস জল খেয়ে মেজাজ খিঁচড়ে দরজা খুলতেই এক প্রাপ্তবয়স্ক লোক সামনে দাঁড়িয়ে।
– নমস্কার, আপনিই ভুজঙ্গবাবু?
– হ্যাঁ। কি চাই?
– আজ্ঞে, একটু কথা ছিলো। ভেতরে আসতে পারি?
নিমেষে কুন্চিত ভ্রু নিয়ে ভুজঙ্গবাবু ভাবলেন, কাউকে বিশ্বাস করা যায় না আজকাল। তাঁর এই এত্তো বছরের জমানো ধনসম্পদ যদি ব্যাটা লুটে নিয়ে পালায়, তাহলে তাঁর রেপুটেশন যথার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
– না, যা বলার ওখান থেকেই বলুন। আর, কিছু বল‍ার না থাকলে ভাগুন।
– না, মানে, একটু পরামর্শের দরকার ছিলো। আর, ‍অাপন‍ার চেয়ে অভিজ্ঞ মানুষ এ পাড়ায় আর কে আছে বলুন?!
গোঁফটাকে সরলরেখা বানিয়ে মুচকি হেসে খানিক গর্ব বোধ করলেন ভুজঙ্গবাবু। এতোকাল নিজের সম্বন্ধে সবার মুখে গালিগালাজ ব্যতিত আর কিছুই শোনেননি। যদিও ধনাত্মক বিশেষণের অভাব তাঁর অন্তর্সত্ত্বার কিপ্টেমিকে তিলমাত্র ক্ষুণ্ন করতে পারেনি, তবুও, প্রথমবার নিজের সম্বন্ধে অন্যের মুখে ভালো কিছু শুনে বেশ লাগলো তাঁর।
– আসুন ভেতরে। তবে, জুতো খুলে। আমি মাসে একবারই এই ঘরের মেঝে পরিষ্কার করি। কালই করেছি।
– আপনি যা বলবেন।
মধ্যবয়স্ক লোকটি ভেতরে এসে সোফায় বসলো। কথা প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, ভুজঙ্গবাবুর সোফাটি তাঁর এক মাসি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন বছর কুড়ি আগে। তিনি খুব ক্ষিপ্ত হন্, তাঁর মতে একটি খাটিয়ার ওপর যখন বসা, শোয়া, পড়াশোনা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ সম্পাদিত হতে পারে, তখন সোফা কিনে ফালতু খরচার কোনও অর্থ নেই।


ভুজঙ্গবাবু বলে উঠলেন,
– হ্যাঁ। তা, মহাশয়ের কি কাজে আসা হয়েছে?
– বলছি। তার আগে অতিথি আপ্যায়ন করুন। প্রথমবার আপনার বাড়ীতে এলাম। চা-মিষ্টি কিছু দেবেন না?
– আপনি খুব হ্যাংলা, মশাই! এভাবে সামনে থেকে কেউ চায়?
– না। মানে, ভাবলাম, এতো বিশাল অর্থভান্ডারের দায়িত্ব আপনাকে দেবো, আর আপনি আমায় এককাপ চা খাওয়াতে পারবেন না?!
– কোন অর্থভান্ডার? একটু খোলসা করে বলবেন?
– বলছি। আগে চা টা পাই! এতোটা রাস্তা হেঁটে ঘেমে গিয়েছি। শরীরটা একটু জুড়োই। তারপর বলছি।
– চায়ে চিনির প্রয়োজন নেই তো?!
– বলেন কি?! চিনি ছাড়া চা ইজ লাইক ফুটো ছাড়া টাইটানিক।
– মানে, চিনিটাও জোগ‍ান দিতে হবে।
– আলবাৎ।
মিনিট তিনেকের মধ্যে গরম চা এনে হাজির করলেন ভুজঙ্গবাবু।
– আজ্ঞে, বিস্কুট?!
– তার কথা তো হয়নি।
– সব কি আপনাকে বলে দিতে হবে মশাই?! অতিথি সৎকার বোঝেন না? আপনি এত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি।
– আনছি। একটা?
– উঁহু! তিনটে।
কটমট করে খানিকক্ষন ত‍াকিয়ে বিস্কুট আনলেন ভুজঙ্গবাবু।
– ধন্যবাদ। সিগ্রেট পাওয়া যাবে?
– ধূমপান করি না। উপরি খরচা হয় তাতে।
– ও হ্যাঁ! আপনি তো আবার ব্রেকফাস্টও করেন না।
– আপনি জানলেন কিভাবে?
– জানি। জানি। পাড়ার লোকেদের মুখে শুনেছি। আপনার মতো হাড়কেপ্পন লোক পুরো ভারতবর্ষে দুটি মেলা ভার।
– হুম। সে যাই হোক। দু’বেলা পেট ঠুসে খাই। মাঝখানে আর খুচুর খুচুর চপ, কেক, মুড়ি ইত্যাদি খাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। খরচা বাঁচে। কিন্তু আপনি কি জন্যে এসেছেন সেটা বলবেন? কোন বিপুল অর্থভান্ডারের জন্যে কি ব্যাপার বলুন।
– বলছি। উতলা হচ্ছেন কেন? ধৈর্য্য রাখুন। এতো বদরাগী মেজাজ ভালো নয়। নিউজ চ্যানেলে বলে, হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, কিংবা ধরুন নিউমোনিয়া।
– নিউমোনিয়া?! আপনি তো মশাই মূর্খও বটে।
– তা বলতে পারেন। এই অধমের জ্ঞানগম্যি যথাসম্ভব স্বল্প।
– চা তো শেষ হতে চললো। এবার তো বলুন।
– আপনি প্রতিদিন সকালে মর্নিং ওয়াকে যান। কিংবা ধরুন, মাঝে মধ্যে পার্কে, বাড়ীর ছাদও তো রয়েছে, সেখানে গিয়ে বসুন।
– তাতে কি উদ্ধার হবে?
– হৃদয় সতেজ হবে।
– আমার হৃদয় যথাসম্ভব সতেজ রয়েছে এবং থাকবে। হুলোমার্কা নজর দেবেন না।
– ছি..ছি..নজর দেবো কেন?! আপনার জন্যে খুব চিন্তা হয়।
– আপনি আবার কোন্ শুভাকাঙ্ক্ষী এলেন?
– জাভেদকে মনে আছে স্যর?
– নাইন্টি সেভেন?
– হ্যাঁ স্যর। আপনার তো মনে আছে দেখছি।- কিভাবে ভুলবো বল্?! তোদের কতো পিটিয়েছি। হতচ্ছাড়া সব। তা অ্যাদ্দিন পর কি মনে করে?!
– আমার মেয়েটাকে পড়াতে হবে স্যর। খুব বিচ্ছু। জানি, আপনি প্রাইভেট টিউশন দেন না। তাই রিকোয়েস্ট করছি স্যর। আপনি ছাড়া ওকে আর কেউ অঙ্ক বোঝাতে পারবে না।
– বটে?
– আসবেন তাহলে?
– যাবো যাবো।
– আজ তাহলে উঠি স্যর।
– আয়।
– সরি। আপনার চা-বিস্কুট মিলে অনেক খরচা করিয়ে দিলাম।
– বেতনে অ্যাডজাস্ট করে নেবো।
– (মুচকি হেসে) আসছি স্যর।

(ইলাস্ট্রেশন- http://www.clipartof.com)

26/11

– এতক্ষণ কি খুচখুচ করছিস মোবাইলে?

– ঝিঙ্কু একখানা স্টেটাস দেবো ফেবুতে, ভাবছি কি দেবো। 

– কেন? আজ কোনো প্রেমের গপ্পো পড়লি নাকি?

– আরে না..না..কি যে বলো…

– তবে?

– আজ অ্যানিভার্সারি না?!

– কিসের?

– ঐ যে, মুম্বই অ্যাটাকের!

– ও…হ্যাঁ..আজ তো ওটাই ট্রেন্ডিং! তা কিছু বেস্ ঠিক করলি? 

– মানে?

– মানে, পাকিস্তানকে খিস্তি দিবি নাকি ইসলামকে?

– ইয়ে…ওই ব্যাপারেই একটু ঘেঁটে আছি।

– কেন? তখন তো গলা ফাটিয়ে আইডিওলজিস্টদের সাথে গলা মেলাচ্ছিলি..”ইসলাম মুর্দাবাদ”! আজ নেতিয়ে পড়লি?!

– নেতিয়ে পড়িনি…ওই একটু ইতস্ততঃ বোধ করছি। ধর্মের ব্যাপার তো!

– আচ্ছা?! তাই না?! ইসলামে কি এই খুনগুলোর সুপারি দেওয়া ছিলো? কি মনে হয় তোর?!

– না..মানে..ওরা আর কি পারে বলো?! আমাদের পুরো নগ্ন করে দিলো!

– আচ্ছা..তুই তাহলে ঐ আবরনের কাপড় খুঁজছিস?

– আমি যুদ্ধ চাইছি! কোরানকে তার যোগ্য জবাব দেব!

– কার্গিল পার্ট টু?! তা এই যুদ্ধের লক্ষ্য কি হবে? কোরানের মৃত্যু ?

– হুম..আমরাই শ্রেষ্ঠ!

– ও..তা বটে…তুই তো রীতিমতো ঐ সেলিব্রিটিদের মতো দাবি করছিস!

– কোন সেলিব্রিটি?

– ঐ যে, যারা আমাদের নয়, মনুষ্যত্বকে নগ্ন করেছিলো, ইসলামকে ছিঁড়ে ফেলেছিলো…ঐ বোটে আসা মানুষখেকো বর্বরগুলো…যারা ধর্মের এক শতাংশ বুঝলেও আল্লাহ্ বলতেন “মোগ্যাম্বো খুশ হুয়া”!

(চিত্র সংগৃহিত)

ব্রেক আপ অন্ থার্টিফার্স্ট

– থ্রো অফ্ রসগোল্লা।

– পাগল নাকি? ভয়াবহতাটা বুঝিস?

– খুব বুঝি। এটাই খানিক ডিফারেন্ট অ্যান্ড হেল্থ ফ্রেন্ডলি।

– তাই বলে রসগোল্লা? প্লিজ! ট্রাই সামথিং এল্স।

– দেন্, উমম্…কচুরি।

– ইম্পসিবল। এই সব জিভে জল আনা হ্যাবিটগুলো গিভ আপ করতে পারবো না বস্!

– বাট্, নিউ ইয়ার রিস্যোল্যুশন্-এ কিছু নতুন অভ্যেস শিরোধার্য করার সাথে কিছু গিভ আপ্ ও করতে হয়।

– তুই ফোর্স করলি বলেই তো নিলাম, ‘আরলি রাইজ’ অ্যান্ড ‘মর্নিং ওয়াক’! কিন্তু ‘রসগোল্লা’ আর ‘কচুরি’ গিভ আপ্? মাঠে মারা পড়ে যাবো রে!

– কিস্যু করার নেই। দিস ইজ দ্য নিয়ম।

– বলছি, আরও তো উপায় আছে, অল্টারনেটিভ?

– আছে বৈ কি! স্পটলাইটে লুঙ্গি পরে ডিস্কো ডান্স কর, কিংবা গড়ের মাঠে গড়াগড়ি খা।

– সারকাজম?

– ফুঃ! সারকাজম্ ব্যাপারটাই সারকাস্টিক। হনুমানদের মতো। কেউ বলে ভগবান, কেউ বলে হনুমান।

– ক্যাবলামার্কা যুক্তিতক্কো করিস না, প্লিজ।

– সরি, ‘ক্যাবলা’ নামে বাংলা অভিধানে কোনও শব্দ নেই।

– থামবি এবার?

– আগে ডিসাইড কর কি ছাড়বি?

– ইয়ে, প্র্যাক্টিক্যালি ভাবতে গেলে পুরোনো বছরটাকে তো এমনিতেই ছাড়ছি। আর তার সাথে পুরোনো ক্যালেন্ডার।

– আর?

– তোকে।

– সে তো কবেই ছেড়েছিস। চার বছর হয়ে গেলো।

– ইম্প্যাক্ট টাই আলাদা, তাই না! ফুচকার স্টলে লঙ্কার ইম্প্যাক্টের মতো। থার্টি ফার্স্ট ডিসেম্বরে ব্রেক আপ! ভাবা যায়!

– ইম্প্যাক্ট? অবশ্য, তাই বলতে পারিস।

– দুঃখ হয় নাকি?

– নাঃ! বছরগুলোই শুধু ঘোরে। ক্যালেন্ডার বদলায়। সময়ের মৃত্যু হয় না।