মাউন্টব্যাটেন সাহেব পাততাড়ি গোছানোর পর আটষট্টি বছর কাটিয়েছি মহানন্দে। ‘গড্ সেক’, দেশ অবশ্যই উন্নতি করছে। হাইওয়ে, ফ্লাইওভার, ট্রাফিকজ্যাম, শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স, বিউটি পার্লার ইত্যাদি যুগান্তকারী বস্তুগুলি তো রয়েছেই, এছাড়া থ্রি-জি, ফোর-জি এসবের কথাও বা আগে কে ভেবেছিলো! অকপটে একথা স্বীকার করা যায় যে এসবের পেছনে ফিরিঙ্গিদের বিশাল বড়ো হাত রয়েছে। নয়তো এরকম ‘ব্যাকডেটেড’ দেশের পক্ষে কোনওদিনও এগুলোর মুখ দেখা সম্ভবপর ছিলো না। তবে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ আমাদের দেশের সর্বোত্তম বৈশিষ্ট। ‘বৈচিত্র্য’ তো আর আজকের আমদানি নয়! ‘স্রষ্টা’ নিজে সম্পূর্ণ দুনিয়াটাকেই যখন বৈচিত্র্যময় করে তৈরী করেছেন আমাদের দেশই বা বাদ যায় কেন! আর, শ্রেণীবৈষম্যও সেই আর্যদের যুগ থেকে চলে আসছে। সেই ধারাবাহিকতার ফলস্বরূপ বাড়তি কায়দাবাজি করে একদল মাণ্যগণ্য রাখববোয়ালথের ঝাঁক মোরালিটির মাথা কামিয়ে চলেছে, আর পরিস্থিতির সমতাবিধান করার জন্য অপর এক দল বস্তির ঘুপচি অন্ধকার ঘর থেকে গাছের তলা, গাছের তলা থেকে মন্দিরের দালান, মন্দিরের দালান থেকে ফুটপাতে চক্রাকারে ক্রমাগত হাওয়া বদল করে চলেছে। বুদ্ধিজীবীরা চায়ের দোকানে, স্টাফরুমে, ডায়েরির পাতায় ক্রমাগত বিদ্রোহ ঘোষণা করলেও ওপরমহল ‘ডোন্ট কেয়ার’ পন্থায় একটু বেশী বিশ্বাসী। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি দিনের শেষের গন্ধ রুমালের মতো ফ্যালনা হয়েই রইলো! একদল যখন গর্জে উঠছে ‘উই নিড রিয়্যাল ফ্রিডম, নট্ পলিটিক্স’ তখন অপরদল নাক ডেকে ভাতঘুম দিচ্ছে। বরঞ্চ বিরক্ত হয়ে জানালার পর্দাগুলো ভালো করে নামিয়ে একটু শান্তি চাইছে। নেতা-নেত্রীরা ব্যারেলভর্তি প্রতিশ্রুতি নিয়ে লক্ষাধিক মানুষভর্তি ময়দানের মাঝে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্যারেল থেকে প্রতিশ্রুতি তুলে স্প্রে করছে মানুষের মাঝে। গণতন্ত্র দামামা বাজিয়ে বলে চলেছে, ‘আমাদের জয় নিশ্চিত’।
ওদিকে এই রাজা-রাজড়াদের যুদ্ধের রাইফেলের গুলি ক্রমাগত বিঁধে চলেছে ফুটপাথের সম্রাট-সম্রাজ্ঞীদের পাঁজরে। মুকুট হারিয়ে, সিংহাসন হারিয়ে, রক্ত হারিয়ে, মাংস হারিয়ে, খাদ্য হারিয়ে ওরা জীবন্ত কঙ্কালের মতো চোখে আঙুল দেখিয়ে রাখছে সভ্যসমাজকে। তাতে অবশ্য আমরা থোড়াই কেয়ার করি! একবিংশ শতাব্দীর অতিউন্নয়নের সমাজে দাঁড়িয়ে আমরা কিনা ফালতু কয়েকটা কঙ্কালকে ভয় পাবো? কভি নেহি! সানগ্লাসের ওপর দিয়ে যদিও বা ভুলবশত ওদের দিকে চোখ যায় তবে নাক সিঁটকে স্তোকবাক্য আওড়াবো, ‘দেশ দেখেনি, তুচ্ছ আমজনতা কী দেখবে?’ অবশেষে সারাদিন অক্লান্ত কাজের পর বাড়ী ফিরে গান্ডে-পিন্ডে গিলে এক লম্বা সুখনিদ্রা!
প্রতিবছর না চাইতেও দিনটি ঘুরেফিরে আসে, কষিয়ে চড় বসায় আমাদের মতো ‘চোখে-আঙুল দাদা’-দের গালে! আড়ালে খিস্তি করে। দিনটি আমাদের প্রতিসম গণতন্ত্রের ‘স্বাধীনতা দিবস’। সেই ‘স্বাধীনতা দিবস’, কয়েকশো বিখ্যাত আর কয়েকলক্ষ বেনামী শহিদদের সমুদ্রমন্থনে উঠে আসা বিষ। কিন্তু নীলকন্ঠ কোথায়? আছে কি? আছে বোধহয়! ওঃ, নীলকন্ঠ তো নিজেই বিষদাঁতধারী।
সকাল হতে না হতেই কচিকাঁচাদের দল প্রভাতফেরী করতে নেমে পড়ে রাস্তায়। এরপর পতাকা উত্তোলন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি ইত্যাদি করে উদযাপন করা হয়। অন্যদিকে এই ছুটির দিনটিকে যথাযথভাবে ইউটিলাইজ করার উদ্দেশ্যে বেশ কিছু চালাকেরা পনেরো দিন আগে থেকে সম্পূর্ণ নির্ঘন্ট তৈরী করে রাখে। সকালবেলা সিনেমা, দুপুরে মাংস-ভাত বা ফাইভস্টার হোটেলে লাঞ্চ, বিকেলে পার্কে বা ফুটবল মাঠে খেলাধূলো ও রাত্রে ‘জাস্ট’ একটুস্ কয়েক পেগ, ব্যস!
ওরা বলে ‘এই তো সুযোগ’, আমরা বলি ‘পরিবর্তন আসুক’, নেতারা বলেন ‘এই বেশ’, আড়ালে দেশ ঘোমটা টেনে মুচকি হাসে। দু’ দিনের জন্য ফেসবুকে কয়েকজন প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে ‘লেট দ্য নেশান টু শাইন’। ‘আজাদী’ ডাউনমার্কেট হয়ে গেলে আবার আগের বিকট স্মাইলমার্কা ছবি ফিরে আসে। বছরের পর বছর যায়, ‘স্বাধীনতা’ বাক্সবন্দী হয়েই থাকে। নিয়মমাফিক ‘স্বাধীনতা দিবস’-এ প্যারেড, মার্চিং, পতাকা উত্তোলন, দেশভক্তির গান, অনুষ্ঠান ইত্যাদির পর যেটুকু দেশভক্তি বেঁচে যায় পরের দিন খবরের কাগজে ধর্ষণকান্ডের খবরে তা ফুটে বের হয়ে আসে॥
